শিরোনাম
স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৪ অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে ওমরাহ পালনের অনুমতি দেবে সৌদিআরব অবশেষে ৩ অক্টোবর পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন বেফাকের বিতর্কিত মহাসচিব আবদুল কুদ্দুস ৭১ টিভিতে আমাকে জড়িয়ে জঘন্য মিথ্যাচার করা হয়েছে; ক্ষমা না চাইলে মামলা করব : কারী রিজওয়ান আরমান জাতিসংঘের কি আদৌ প্রয়োজন আছে? সীমান্ত এলাকাকে আবারো অশান্ত করছে মিয়ানমার সমস্ত শয়তানি কার্যক্রমের উৎস হচ্ছে ইসরাইল-আমেরিকা: হুথি আনসারুল্লাহ হাটহাজারীতে আল্লামা আহমদ শফীকে কটূক্তি; শীর্ষ আলেমদের উদ্যোগে করা হচ্ছে মামলা ভারতের সঙ্গে কষ্টে গড়া সম্পর্ক ছোট্ট পেঁয়াজে নষ্ট হচ্ছে: সংসদীয় কমিটি ২১শে ফেব্রুয়ারি নয়, পশ্চিমবঙ্গে নতুন মাতৃভাষা দিবস চালুর চেষ্টায় বিজেপি আল্লামা আহমদ শফী রহ. -এর মাগফিরাত কামনায় রংপুরে দোয়া-মাহফিল অনুষ্ঠিত
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৬:৫৯ পূর্বাহ্ন
add

আবুল হাসান আলী নদভীর (রহ.) বয়ানে সমকালীন সময়ে একজন আদর্শ আলেমের পরিচয়

কওমি ভিশন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০
add

আবু জোবায়ের


[আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) তাঁর সমকালীন সময়ে শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে লেখনী ও বক্তৃতায় এক বিশেষ রুচি ও যোগ্যতা দান করেছিলেন। তাঁর লেখনী ও বক্তৃতা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ও সমাদৃত। তালিবে ইলম ও উলামায়ে কেরামদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত তাঁর বিভিন্ন ভাষণের নির্বাচিত অংশ নিয়ে এই লেখা তৈরি করা হয়েছে।]

আলেমগণ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়ারিছ। তাঁর পরে আলেমরাই এই দীনের ধারকবাহক। তাদের উপরই নির্ভর করে দীনের উন্নতি, অগ্রগতি, গতিশীলতা ও প্রামাণিকতা। আদর্শ আলেমরাই মুসলিম জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তারা আদর্শ। অনুসরণীয়। পথের দিশারী। সংশোধনকারী।

আলেমদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এটা যেমন আনন্দের তেমন আশংকার। মাদ্রাসার নির্দিষ্ট সিলেবাস শেষ করা প্রত্যেকেই যোগ্য ও আদর্শ আলেম হতে পারে না। একজন  আদর্শ আলেমকে নবুওয়াতে মুহাম্মদীর যথার্থ প্রতিনিধিত্ব করতে হয়। নববী ঈমান, ইলম, আমল, আখলাক, চিন্তা ও চেতনা ধারন করতে হয়, সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হয়।

আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) এর বর্ণনা থেকে সমকালীন সময়ে একজন আদর্শ আলেমের পরিচয় ও প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করব। রব্বি ইয়াসসির!

আলেমদের গুরুদায়িত্ব
আলেমদের এক প্রান্ত সংযুক্ত নবুওয়াতে মুহাম্মদীর সঙ্গে, অপরপ্রান্ত সংযুক্ত জীবন জগতের সঙ্গে। এটাই তাদের শ্রেষ্ঠত্বের রহস্য। নবুওয়াতে মুহাম্মদীর সঙ্গে সংযোগ একদিকে যেমন মহা সৌভাগ্য ও মহাপ্রাপ্তি। অপরদিকে তেমনি অপরিমেয় মহা দায়িত্বের কারণ। পৃথিবীতে অপর কোন দল ও গোষ্ঠীর কাঁধে এরূপ নাজুক, এত ব্যাপক ও এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে বলে আমার জানা নাই।

অনুসরণীয় ঈমান, ইলম ও আখলাক
নবুওয়াতে মুহাম্মদীর সত্যতা ও যথার্থতা, এর যৌক্তিকতা ও চিরন্তনতা, এর সর্বকালীন উপযোগিতা, এর ব্যাপ্তি ও বিশালতা, এর অত্যুচ্চ মর্যাদা এবং এর বিশুদ্ধতা ও পূর্ণাঙ্গতার ব্যাপারে আলেমদের অন্তরে থাকবে অবিচল ইয়াকীন, দ্বিধাহীন বিশ্বাস। এর বিপরীতে অন্য সব কিছুকে অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে জাহিলিয়াত, মূর্খতার উত্তরাধিকার বলে জ্ঞান করবে।

আলেমদের ঈমান হবে তাদের সত্তা অতিক্রম করত অন্যদের উপর প্রভাব বিস্তারকারী, যা শত-সহস্র মানুষকে ইয়াকীন ও বিশ্বাসে আপ্লুত করবে।
নববী শিক্ষা সম্পর্কে অন্যদের ভাসা ভাসা জ্ঞান থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু আলেমদের জন্য এই জ্ঞানে পাণ্ডিত্ব ও বিদগ্ধতা, নিপুণতা ও দৃঢ়তা থাকা অপরিহার্য।
অপরিহার্য নববী ইলমের প্রতি ইশক ও প্রেম, অনুরাগ ও ভালবাসা। অতীব জরুরী এই ইলমে আত্মলীনতা,  একাগ্রতা ও অনন্যমনস্কতা। এতদ্ব্যতীত দাওয়াতি কার্যক্রমের কল্পনাও অর্থহীন।
আলেমরা নববী ইলমের পাশাপাশি নববী গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যাবলীরও অধিকারী হবে; যেমন– ইয়াকীন ও ইখলাস, ঈমান ও ইহতিসাব তথা বিশ্বাস ও নিয়তের পরিশুদ্ধতা, সকল কাজের লক্ষ্য নির্ধারণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তাআল্লুক মাআল্লাহ ও আল্লাহর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন, ইনাবত ও ইখবাত তথা আল্লাহমুখিতা ও আল্লাহ-নিবিষ্টতা, খুশু-খুযু, বিনয় ও নম্রতা, দুআ ও ইবতিহাল তথা প্রার্থনা ও কাকুতি-মিনতি, আত্মবিনাশন ও আত্মমর্যাদা সচেতনতা, ইত্যাদি।

আলেমদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সফলতা লাভ করতে হলে এই উভয়বিধ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে সমানভাবে। এতদ্ব্যতীত ইলম ও জ্ঞানের পাণ্ডিত্ব পরিণত হবে সৌরভ ও সজীবতাহীন কাগজের ফুলে। বর্তমান দুনিয়ার কাগুজে ফুলের কোন অভাব নেই। অভাব বাগে নবুওয়াতের সজীব ও সুরভিত ফুলের, যা আপন সৌরভে জীবন জগতকে করবে মাতোয়ারা।

বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী হবে
বর্তমান আলেমদের মধ্যে সেই প্রাণ অনুপস্থিত, সেইসব গুণ ও বৈশিষ্ট্য হতে তারা নিঃস্ব, সেই সঞ্জীবনী শক্তি হতে বঞ্চিত, যা জাতিকে নতুনভাবে চিন্তা করার প্রেরণা যোগাতে পারত, তাদেরকে আমূল পরিবর্তন গ্রহণ করতে শক্তি দান করতে পারত। যুগ বড় সত্যাগ্রহী, সত্য-সচেতন। সে শ্রদ্ধা করে শুধু সমুন্নতকেই। মেধা ও মস্তিষ্ক শুধু নত হয় উন্নত ও সমৃদ্ধ মেধার সামনেই। মাদ্রাসাগুলোতে বর্তমানে মেধা ও প্রতিভার অবনতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। হৃদয়ের উষ্ণতাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। কবির ভাষায়–

“চোখে নাই প্রেমানন্দের দীপ্তি, চেহারায় নাই ইয়াকীন ও বিশ্বাসের ঔজ্জ্বল্য।”

ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় বর্তমান যুগে প্রতিষ্ঠান হতে শিক্ষা গ্রহণ শেষে অধিক সংখ্যক হারে আলেম বের হওয়ার পরও সমাজে তাদের কোন প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে না। জীবন জগতে আলেমগণ কোন আবেদন সৃষ্টি করতে পারছে না।

আজ বড় প্রয়োজন জীবন জগতের আমূল পরিবর্তন সাধনকারী কিছু বিপ্লবী ব্যক্তিত্বের। যারা সমাজের গতিপথ বদলে দিবেন। উম্মাহকে সংশোধন করবেন।

উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি লালন করবে

বর্তমানে মাদ্রাসার বিরাজিত সবচেয়ে বড় ফেতনা, সবচেয়ে বড় মানসিক মহামারী হচ্ছে, ছাত্রদের মধ্যে ক্রমবর্ধিত হীনমন্যতা। যা ঘুণপোকার ন্যায় এই বিশাল বৃক্ষকে কুরে কুরে খাচ্ছে। কবি বলেছেন–

“যে হতে পারত আসীন যুগ-নেতৃত্বের আসনে
সেই ঘুণে ধরা মস্তিষ্ক এখন যুগের দাস।”

দ্বিধাহীনচিত্তে বলা যায়, আলেমরা হেয় নয়, হীন নয়, শুধু হীনতাবোধের ব্যধিতে আক্রান্ত। এই হীনতাবোধের সৃষ্টি মূলত আত্মপরিচয়ের অভাব ও আত্মবিস্মৃতি থেকে। নিজেদের সম্পর্কে আমাদের নিজেদের বোধ ও দৃষ্টির যে দিন পরিবর্তন ঘটবে, সে দিন পৃথিবীরও পরিবর্তন ঘটবে। কথক সামান্যও ভুল বলেন নি–

“স্বীয় মর্যাদা সম্পর্কে তুমি যদি হও সচেতন
জীন ও ইনসান হবে তোমার সৈনিক, তুমি হবে সেনাপতি।”

যুগের দাবি পূরণ।

উলামায়ে ইসলামের মেধা ও চিন্তা, ইসলামের খেদমতে তাদের আবেগ ও উদ্দীপনা কখনও কোন স্থানে এসে স্থবিরতার শিকার হয়ে পড়বে না কিংবা প্রাচীন প্রথা ও রীতিনীতির কাঙ্গাল হয়ে থাকবে না। তারা চলমান জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে চলবে। তাদের দৃষ্টি সর্বদা যুগের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।  ইসলামের খেদমতের জন্য স্বীয় যুগে যা কিছু প্রয়োজন, যে পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া অবলম্বনের প্রয়োজন অকৃত্রিম আন্তরিকতার সাথে তাঁরা তাই গ্রহণ করবে, তাই অবলম্বন করবে।

তাঁরা ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার, ইসলাম ও দ্বীনের খেদমতে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ থাকবে। নির্দিষ্ট কোন প্রতিষ্ঠান, কি নির্দিষ্ট কোন গোষ্ঠীর, কি নির্দিষ্ট কোন উৎসের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও কর্মপদ্ধতি অপ্রয়োজনেও তাঁরা আঁকড়ে ধরে রাখবে–  এরূপ কোন শপথ তাঁরা করতে পারে না।

আলেমগণ কোন প্রয়োজনকে স্বীকার করে নিতে এবং তথ্যমাফিক কল্যাণকর ও অপরিহার্য কোন বিষয়কে গ্রহণ করে নিতে কখনও দ্বিধা করতে পারে না। এ কারণেই মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে প্রত্যেক যুগেই নিয়মিত ধারায় পরিবর্তন পরিবর্ধন ও সংযোজনের ঘটনা ঘটেছে।

প্রয়োজন বহুমুখী যোগ্যতার

আধুনিক বিপ্লবের এই যুগে দীনের প্রতিনিধিত্ব ও ইসলামের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্যই শুধু নয়; বরং ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতার চিত্র রূপায়ণের জন্যও প্রয়োজন অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জনের এবং বিভিন্নমুখী যোগ্যতার অধিকারী হওয়ার। আলেমরা ইসলামের সৈনিক। জীবনের বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য আলেমরা নিজেদের প্রস্তুত করেছেন। তাঁরা দেখবে কোন অস্ত্র যুদ্ধের জন্য সর্বাধিক কার্যকর, কোন রণকৌশল অপেক্ষাকৃত অধিক ফলপ্রসূ। প্রয়োজনীয় ও কার্যকর সকল অস্ত্রে ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ হওয়া তাদের জন্য অপরিহার্য।

আলেমগণ নবাগত সকল ফেতনা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত থাকবে। কারণ, কোন বিষয়ে ভাসা ভাসা জ্ঞান ও অভিজ্ঞান অজ্ঞানতা অপেক্ষা অধিক ক্ষতিকর। তাঁরা মাদ্রাসার ফিরাকে বাতিলার নামকাওয়াস্তে পাঠদানের বাইরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক উস্তাদের দিক-নির্দেশনায় এবং তাদের তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর অধ্যায়ন করবে এবং তুলনামূলক অধ্যয়ন করত ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য সপ্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করবে। কাজটি দুরূহ হলেও অপরিহার্য ভেবে করবে।

ভাষা ও সাহিত্যের সাথে ঘনিষ্ঠতা

কোন দেশে দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও দীনের কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য ঐ দেশীয় ভাষা ও সাহিত্যে পূর্ণ দখল থাকা জরুরী। একজন আলেমের রুচিশীল ও মানোত্তীর্ণ  ভাষায় নিজের চিন্তা-চেতনা প্রকাশের যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকবে। বক্তৃতা ও লেখনীতে প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় ভাষাশৈলী প্রয়োগের দক্ষতা থাকবে। এটা এমনই এক প্রকৃতিগত সত্য অনিবার্য বাস্তবতা যে, নবীগণকে পর্যন্ত স্বীয় সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শনের জন্য তাদের মন-মস্তিষ্কে প্রভাব বিস্তারকারী উচ্চমান সম্পন্ন সম্মোহক ভাষা দান করা হয়েছিল।

আরবী ভাষায় দক্ষতা অর্জন

বর্তমানে আরবি ভাষা শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত একটি ভাষা। আরব দেশসমূহে এই ভাষা বর্তমানে উৎকর্ষের শীর্ষে উপনীত পূর্ণ যৌবনদীপ্ত এক ভাষা। আমাদের মাদ্রাসাগুলোতে বর্তমানে যে পদ্ধতিতে, যে মানের আরবী ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষাদান করা হচ্ছে তাতে আর যাই হোক আরব দেশসমূহে তা দিয়ে কোন ইলমী খেদমত ও দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে এবং দীন ও মুসলমানের সঠিক দিক-নির্দেশনার কাজে আলেমগণ যদি অবহেলা প্রদর্শন করেন, তবে নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাসের সংরক্ষণ

আলেমগণ সমকালীন সমূহ ফেতনা ও বৈরি সংকটের মোকাবেলা করবে। রসম ও রেওয়াজ, বেদআত ও কুসংস্কার এবং জাহেলী রীতি-নীতি ও সংস্কারের বিরুদ্ধে নিরন্তর দাওয়াত ও সংগ্রামে কোন প্রকার শৈথিল্য প্রদর্শন করবে না।

আধুনিক যুগে নতুন নতুন ফেতনা আত্মপ্রকাশ করছে। পুরানো জাহিলিয়াতের প্রকাশ ঘটছে নতুন রূপে। পূর্বে ছিল বিদআতের সমস্যা, কিন্তু এখন প্রচলন লাভ করছে স্পষ্ট পৌত্তলিকতা ও প্রাচীন মূর্তিপূজা সদৃশ ধ্যান-ধারণা ও কার্যকলাপ। এই পরিস্থিতি আমাদের দীনি মূল্যবোধ, আমাদের দীনি স্বাতন্ত্র্য ও আমাদের তাওহীদী আকিদা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। দেখার বিষয় হলো এখন আলেমরা এই চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করবে।

বিতর্ক এড়িয়ে অন্যদের কাছাকাছি হবে

এখনকার ধর্মীয় দল ও উপদলগুলো একে অপরের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হয়ে আছে। বিতর্কিত যে বিষয়গুলোর সমাধান জ্ঞানগত যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে ঘরোয়াভাবে করা যেত তা জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সর্বত্র যুদ্ধংদেহী মনোভাব গড়ে উঠেছে। এটা অত্যন্ত ভয়াবহ ও সর্বনাশা ব্যাপার।

আলেমরা জনসাধারণের অন্তরে তাদের প্রতি আকর্ষণ ও ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত রাখার মতো ব্যক্তিত্ব-প্রভাব সম্পন্ন হবে। জনসাধারণের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপিত হবে। আধুনিক উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিতজনেরা যেন আলেমদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ না হয়। তাঁরা যেন আলেমদের হাতছাড়া না হয়ে যায়।

ভিন্ন বৈশিষ্ট্যময় জীবনের অধিকারী হবে

আলেমদের জীবন জনসাধারণের জীবন থেকে ভিন্নতর বৈশিষ্ট্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হওয়া প্রয়োজন। দর্শক যেন স্পষ্ট দেখতে পায় যে, আলেমগণ দুনিয়ালোভী নয়। তাদের নিকট ধন-সম্পদ ও বিত্ত-বৈভব জীবনের মাপকাঠি নয়। তাদের সকল কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আল্লাহ তায়ালার অধিকতর সন্তুষ্টি লাভ। আলেমদের মধ্যে যতদিন চারিত্রিক এই বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি না হবে, যতদিন তাদের মধ্যে ত্যাগ ও কুরবানীর মহৎ গুণ সৃষ্টি না হবে ততদিন তাদের ব্যক্তিত্ব সম্মানার্হ এবং প্রভাববিস্তারকারী হবে না।

কোন এক শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ হবে

আলেমদের নিজেদের ভেতর ইখলাস ও ইখতেসাস সৃষ্টি করা উচিত। কোন এক শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞতা ও পান্ডিত্য অর্জন করা দরকার। অর্থাৎ কোন এক শাস্ত্রে অন্যের তুলনায় তাঁর মধ্যে বিশেষত্ব থাকতে হবে। যাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশিত হয়, যারা গভীর জ্ঞানের অধিকারী, গুণধরের গুণ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল তাঁরা যেন বলেন, ‘এই ব্যক্তি অমুক শাস্ত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী, বিদগ্ধ ও পন্ডিত। অনেকের তুলনায় শাস্ত্রটিতে তাঁর দখল বেশি।’

নিজেকে বিক্রি করবে না

একজন আলেম নিজের বিবেক বিক্রয় করতে কখনও প্রস্তুত হবে না। পৃথিবীর কোন শক্তি, কোন ভ্রান্ত দর্শন, কোন ভ্রান্ত দাওয়াত ও আন্দোলন যাদেরকে কোন মূল্যেই খরিদ করতে পারবেনা। যারা নিজেদের জীবনকে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য, জ্ঞান ও হেদায়েতের জন্য কুরবান ও উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হবে।

নিজের মধ্যে উপকারী সত্তার সৃষ্টি

আলেমরা নিজেদের মধ্যে উপকারিত্ব গুণ সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে। তমসাচ্ছন্ন জীবনপথে তাদের দ্বারা যেন একজন পথিক আলোর সন্ধান পায়। তাঁরা এরূপ গুণের অধিকারী হয়ে যাবে, যেন তাদের দ্বারা জ্ঞানবিষয়ক সমস্যার সমাধান হয়। তাদের সংসঙ্গে ঈমানের শক্তি বৃদ্ধি পায়। ঈমান সজীবতা লাভ করে। তাদের নিকট এসে মানুষ সুস্পষ্ট ধারণা ও বিশুদ্ধ জ্ঞান লাভ করতে পারে।

আধুনিক জিজ্ঞাসার সমাধান

আলেমরা কঠোর অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে দীনি ইলমে পাণ্ডিত্ব অর্জন করবে। অতঃপর আধুনিক জিজ্ঞাসা সম্পর্কে অবহিত হবে এবং দীনের আলোকে সেগুলোর সমাধান দান করবে।

বর্তমান‌ সময়ের প্রয়োজনকে তাঁরা পূরণ করবে। যেমন– আধুনিক যুগের চিন্তাগত ও বিশ্বাসগত অস্থিরতার অনুসন্ধান, এর কারণ নির্ণয় এবং তদনুযায়ী যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ। দীনি আদর্শ ও শিক্ষাকে, দীনের মৌল নীতিমালাসমূহকে বাস্তব জীবনের ঘটনাবলি ও কার্যক্রমের সাথে, জীবনযাত্রায় উদ্ভুত সমস্যাসমূহের সাথে সঙ্গতি বিধানের প্রচেষ্টা গ্রহণ। ইসলামী আইনের মর্যাদাকে সুপ্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করণ।

ইলম চর্চায় নিজেকে ব্যস্ত রাখা

নিজেকে কখনও ইলম অন্বেষণ থেকে ফারেগ ভাববে না। যেখানেই থাকবে সব সময় নতুন ও পুরাতন কিতাবাদি অধ্যায়ন করবে। কুরআনের তাফসীর, হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ এবং ইতিহাস গ্রন্থের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখবে। যে সকল কিতাব ইলমুল কালাম বা ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে লিখিত, যে সকল কিতাবে বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাস বিশুদ্ধ রীতিতে লিখিত হয়েছে সে সকল কিতাব সবসময় অধ্যয়ন করবে।

আপনার আশেপাশের সব আলেমই প্রকৃত ও আদর্শ আলেম নয়। বর্তমানে নামধারী আলেমের সংখ্যাও অনেক বেড়ে গেছে। হাদীসের ভাষায় যারা ‘উলামায়ে ছু’ অর্থাৎ অসৎ আলেম। তাদের কেউ দরবারি, কেউ দুনিয়ালোভী, কেউ প্রতারক, কেউ বিদআতী; ইত্যাদি। এদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করুন। আদর্শ আলেমদের সাথে থাকুন। তাদের থেকে ঈমান, ইসলাম ও আমল শিখুন।


তরুণ লিখক,
শিক্ষার্থী: দারুল উলুম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

Leave a comment

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: