আল্লামা কাসেম বাবুনগরী : বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন নিভৃতচারী গবেষক

হাফেজ মাওলানা আছেম বাবুনগরী


আল্লামা কাসেম বাবুনগরী। আজিজী পরিবারের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী নিভৃতচারী এ গবেষক আরবী, উর্দু ও বাংলা ভাষায় বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। হাদিসের আলোকে ফিকহে হানফীকে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। আরবী ভাষায় লিখিত তাঁর গ্রন্থগুলো সৌদি আরবে বেশ সমাদৃত। আরব্য হাদীসবিশারদগণ তাঁর কিতাবে তাকরিজ লিখেছেন। উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সৌদি আরবের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ডক্টরগণ তাঁর থেকে হাদিসের ইজাযত নিয়েছেন। সৌদি প্রবাসী এ বিদগ্ধ আলেমে দ্বীন সৌদি মন্ত্রণালয়ের অধীনে উর্দু ও বাংলা ভাষার দায়ী হিসেবে দাওয়াতী কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। নিম্নে এ জ্ঞানতাপসের সংক্ষিপ্ত বর্ণাঢ্য জীবনালেখ্য  তুলে ধরা হলো।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

আল্লামা কাসেম বাবুনগরী হাফি. ১৯৫৭ সালে বাবুনগর পল্লীতে আজিজী  পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন । তিনি জামিআ আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ সূফী আজিজুর রহমান রহ. এর মেজ সাহেবজাদা জামিআ ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরের প্রথম শাইখুল হাদীস আল্লামা আমীন রহ. এর বড় সাহেবজাদা  জামিআ ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর ও জামিআ  আরবিয়া নসীরুল ইসলাম নাজিরহাটের সাবেক সিনিয়র মুফতী আল্লামা ইউসুফ রহ. এর বড় ছেলে। বাংলাদেশের মধ্যে এটি অনেক উচ্চ  ও অভিজাত বংশ। এর বংশ পরম্পরা ইসলামের প্রথম খলীফা সায়্যিদুনা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এর সাথে সম্পৃক্ত। এ খানদানের একজন উর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ হলেন বুরহানুদ্দীন সিদ্দীকী।তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এর বংশীয় হওয়ায় সিদ্দীকী উপাধি ধারণ করেছেন।

শিক্ষাজীবন

বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী ও প্রতিভাবান। দ্রুত প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ভর্তি হন দেশের সর্বোচ্চ দ্বীনী বিদ্যাপীঠ  জামিআ আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে।

১৯৮১ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৪০১ হিজরীতে তিনি মুমতায বা গোল্ডেন A+ পেয়ে তাকমীলুল হাদীস তথা মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। পাশাপাশি তিনি সরকারি আলিয়া থেকে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পরীক্ষা দিয়ে ডাবল মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। কামিল পরীক্ষায় তিনি  গোটা বাংলাদেশে মেধা তালিকায় ৫ম স্থান অধিকার করেন।

 

কর্মজীবন

শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার সাথে সাথে রাঙ্গুনিয়া আলমশাহপাড়া আলিয়া মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস পদে নিয়োগ পান। একই প্রতিষ্ঠানে তিনি আরবী সাহিত্যের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দীর্ঘ ৭ বছর কৃতিত্ব ও সুনামের সাথে অধ্যাপনার গুরু দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর নকীব পাড়ি জামান সুদূর সৌদি আরবে। সেখানে সৌদি মন্ত্রনালয়ের অধীনে উর্দু ও বাংলা ভাষার দায়ী হিসেবে দাওয়াতী কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

বর্তমানে তিনি সৌদি আরবের আলবাহার একটি প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি লেখালেখি ও গবেষণার ময়দানে বীরদর্পে বিচরণ করছেন।

রচনা ও লেখালেখির ময়দানে আল্লামা কাসেম বাবুনগরী

রচনা,লেখালেখি ও গবেষণার ময়দানে হযরতের সরব পদচারণা রয়েছে। ক্ষুরধার লিখনী ও মজবুত শব্দ গাঁথুনির মাধ্যমে তিনি ইসলামের বিভিন্ন বিষয় জাতির সামনে তুলে ধরছেন সাবলীল ও প্রাঞ্জলভাষায়। বাংলা,উর্দু ও আরবী ভাষা ও সাহিত্যে সমান পারদর্শী হওয়ায় তিন ভাষায় তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। জাল হাদীসের উপরও যথেষ্ট খেদমত করেছেন। হানাফী মাযহাবের বিভিন্ন মতবিরোধপূর্ণ মাসআলা হাদীসের আলোকে দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছেন। বর্তমানে তাঁর লিখিত প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫। তাঁর গ্রন্থগুলো দেশ-বিদেশে বেশ সাড়া জাগিয়েছে।

নিম্নে হযরতের কতিপয় উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম প্রদত্ত হলো।

আরবী ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ

১. ওয়াকফাতু তাআম্মুলিন ফী বা’জি কসসিল আম্বিয়া।

২.ওয়াকফাত হাওলাল জাওয়াল।

৩.ইজাআত হাওলা উম্মিল জামিআতিল আহলিয়া।

৪.বা’জুল কাসায়িদ।

৫.আল আহাদীসুল মাওজুআ ফী মিশকাতিল মাসাবীহ।

৬.আল আহাদীসুল মাওজুআ ফিসসুনানিস সালাসা।

৭.আল আহাদীসুল মাওজুআ ফী মুসনাদিল ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল।

৮. সালাতুল বিতর ও আহকামুহা ফী দাওয়িসসুন্নাহ.

৯. লাইলাতুন্নিসফে মিন শা’বান বাইনাল ইত্তিবায়ি ওয়াল ইবতিদায়ি ।

১০.মুসনাদুল ইমাম আবি হানিফা (তাহাকীক ও তাখরীজ)

বাংলা ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থ

১.ঈদুল ফিতর : তাৎপর্য ও মাসায়িল।

২.তিন আরব্য মনীষা।

উর্দু ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থ

১.তারীখে সাজ সখসিয়্যাত।

২.দারুল উলুমকে সন্দে জাওয়াহির পারে।

অনূদিত গ্রন্থ

১. রসুল সা. এর বহু বিবাহ: বিভ্রান্তি ও সংশয় নিরসন।

মূল : মুহাম্মদ আলী সাবুনী।

২.জীবিকা উপার্জনের মূলনীতি।

মূল : জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ.

এ ছাড়াও হযরতের আরও বহু অপ্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে। যা শীঘ্রই প্রকাশিতব্য।

এতো যৎ সামান্য। কাঁচা হাতের অপরিপক্ক লেখা। অধমের ক্ষুদ্র প্রয়াস। তাঁর জীবনী ও কর্ম  অতল সমুদ্র।এ প্রবন্ধের চেয়ে অনেক  সুবিশাল ও বহু সুবিস্তৃত।

আল্লাহ দ্বীনের এ উজ্জ্বল প্রদীপ ও দেদীপ্যমান আলোকমশালকে আরও বহু দিন কিরণ দেবার তাওফীক দান করুন। তাঁর ক্ষুরধার লিখনী আরও শানিত ও মজবুত করুন। আমীন।


লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিআ মুহাম্মাদিয়া হুসাইনিয়া গাজীপুর, ঢাকা।


বিজ্ঞাপন

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: