ইসলামের আলোকে দুঃসময়ে কী ভাববেন এবং কী করবেন?

আবু জোবায়ের


আমরা জীবনের বাকে বাকে নানা পরিস্থিতির সম্মুখীন হই। প্রতিটা পরিস্থিতি বা মুহূর্ত সুখকর হয় না। থাকে সুখ দুঃখের মিতালি। খারাপ সময়ের কথা ভেবে আমারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হই। স্বাভাবিক। নবীদেরও চিন্তা বা মন খারাপ হয়েছে। তবে তাঁরা আশাহত হননি। দুশ্চিন্তার নিগড়ে বন্দী হয়ে যাননি। হতাশ হয়ে পড়েননি। ইতিবাচক চিন্তা করেছেন। আল্লাহর দয়া ও রহমতের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখেছেন। সেখান থেকে তাঁরা উঠে এসেছেন।

চিন্তা ও দুশ্চিন্তা, মন খারাপ ও হতাশ হওয়া কিন্তু এক জিনিস না। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও হতাশ ব্যক্তি নিজের উপর আশা তো ছেড়ে দেয়ই, আশেপাশের পরিবেশ থেকেও মন উঠিয়ে নেয়। কোথাও কোনো আশার আলো দেখতে পায় না। এভাবে নিজের কল্পিত আঁধারে তাঁরা একসময় হারিয়ে যায়। জীবনের কাছে হেরে যায়।

আমাদের সামনে এখন অনেক মোটিভেশনাল বই বা লেকচার আছে। সেগুলোতে এ জাতীয় সমস্যার সমাধানও দেয়া আছে। কিন্তু সেই সমাধান স্থায়ী নয়। আমাদের সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই একটু ফাঁক-ফোকর থেকেই যায়। কিছুদিন পর নতুন করে সমাধান খুঁজতে হয়। তো আমরা এই সমস্যার সমাধান সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে নিব। কুরআন ও হাদীস মন খারাপ ও হতাশ হওয়ার সমাধানে কী বলে তা জানব।

বিপদ তাকদিরে পূর্ব লিখিত
আপনি যদি বিপদে নিপতিত হোন, কিংবা বিভিন্ন পেরেশানিতে আক্রান্ত হোন, তাহলে আল্লাহর ফায়সালা ও সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করুন। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন— “(হে নবী) আপনি বলুন, আমাদের কাছে (ভালো-মন্দ) কিছুই পৌঁছবে না, কিন্তু যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন।” (সূরা তাওবা: ৪১)

বিপদ কেন আসে?
মানুষ ঈমানদার হোক আর কাফের হোক, নেককার হোক আর পাপী হোক, সবার জীবনেই বিপদ আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা অপছন্দ করা সত্ত্বেও কেনো আমাদের জীবনে এইরকম বিপদ আসে বা আল্লাহ তাআলা কেনো আমাদের পরীক্ষায় ফেলেন? কুরআন ও হাদীস থেকে এর অন্যতম যে কারণগুলো জানা যায় তা হলো:
ক. প্রকৃতপক্ষে কে ঈমানদার আর কে মুনাফিক, কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী তা পরীক্ষা নেয়া। মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানদাররাও অনেক সময় সুখ–স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে মনে রাখে, তার প্রতি অনুগত ও সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু, যখন কোনো বিপদ-আপদ আসে তখন আল্লাহকে ভুলে যায়, কুফুরী করে বা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। আবার অনেক সময় এর বিপরীতও হয়।

“মানুষ কি মনে করে যে “আমরা ঈমান এনেছি” – এ কথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে, আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবেনা? আমি অবশ্যই তাদের পূর্বে যারা ছিলো তাদেরকে পরীক্ষা করেছি। আর আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী।” (সূরা আনকাবুত: ২-৩)

খ. দুনিয়াতেই পাপের সামান্য শাস্তি দেওয়া, যাতে করে সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং নিজেকে পরকালের কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। “কঠিন শাস্তির পূর্বে আমি তাদেরকে হালকা শাস্তি আস্বাদন করাবো, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।” (সূরা সাজদাহ: ২১)

গ. এছাড়া আল্লাহ তার কিছু প্রিয় বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, যাতে করে পরকালে তার মর্যাদা ও জান্নাতের নেয়ামত বৃদ্ধি করেন।

দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতা
“এবং জেনে রাখো, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সন্তান শুধু এক পরীক্ষা এবং নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার।” (সূরা আনফাল: ২৮)

ইবনুল জাওজি (রহ.) বলেছেন— “দুনিয়াটা যদি পরীক্ষার ঘর না হতো, তবে অসুখ-বিসুখ ও কষ্ট-ক্লেশ একের পর এক আসত না এবং কষ্টসাধ্য হতো না নবী-রাসূল ও অলী-আউলিয়াদেয জীবন।”

আবু হাযিম (রহ.) বলেছেন— “যে দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছে, সে সুখের সময় আনন্দে আত্মহারা হয় না; আবার দুঃখের সময়ও খুব একটা বিষণ্ন হয় না।”

হাতিম আল-আসাম (রহ.) বলেছেন— “আমি জানি যে, আমার রিযক আমি ব্যতীত অন্য কেউ খেয়ে ফেলবে না, সুতরাং এ ব্যাপারে আমার হৃদয় প্রশান্ত থাকে।”

বিপদে ঈমানের পরিচয়
দুনিয়া একটা পরীক্ষা ক্ষেত্র। দুনিয়ায় একজন বান্দাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করা হবে। কখনও ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে, কখনও ব্যবসায়িক লসের মাধ্যমে, কখনও-বা প্রিয় জিনিস তুলে নেওয়ার মাধ্যমে।

“আমি তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা, জানমাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি ইত্যাদি কিছু একটা দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। আর তুমি সুসংবাদ দাও ধৈর্যধারণকারীদের।”
(সূরা বাকারা: ১৫৫)

একজন মুমিন কখনও যদি অর্থসংকটে পড়ে যায়, কিংবা একের-পর-এক যাতনা, বিপদ, অসুস্থতা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা কিংবা ক্ষতির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হতে থাকে, তবুও সাহস হারায় না। মনোবল ভেঙে পড়ে না তার।  কারণ, প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী তাঁর মনে পড়ে যায় :

“সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন নবীরা। অতঃপর তাদের নিকটবর্তীরা। এরপর এদের নিকটবর্তীরা। মানুষকে তার ঈমান অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যদি তার ঈমান শক্তিশালী হয়, তাহলে তার পরীক্ষাও কঠিন হয়। আর যদি তার ঈমান দুর্বল হয়, তাহলে তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে হালকা হয়। বিপদ বান্দার পিছু ছাড়ে না, পরিশেষে তার অবস্থা এমন হয় যে, সে পাপমুক্ত হয়ে জমিনে চলাফেরা করে।” (তিরমিজি শরীফ)

আল্লাহই আমার সব
“আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি।” (সূরা ইউসুফ: ৮৬)

দুঃসময়ে অনেকেই দুশ্চিন্তায় ভোগে– আগামীর ভবিষ্যৎ কেমন হবে এবং এই ভয়ানক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা যাবে কি না ইত্যাদি। এমন ক্ষেত্রে এই দুআটি ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল’- পড়লে উপকার পাওয়া যাবে। ‘আল্লাহ তাআলাই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি খুবই উত্তম তত্ত্বাবধায়ক’। এই দুআটি অর্থ বুঝে এবং গভীরভাবে অনুধাবন করে পড়লে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ দূরীভূত হবে। কেননা সে ভাববে যে, আল্লাহ তাআলাই আমার উত্তম অভিভাবক; অতএব তিনিই সম্ভাব্য সব ধরনের বিপর্যয় ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করবেন।

কোন কিছুই সাধ্যাতীত নয়
“আল্লাহ কাউকে তাঁর সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না।” (সূরা বাকারা: ২৮৬)
কিছু কিছু সময় এমন মনে হয়, আর পারব না। এত কষ্ট আর সহ্য হয় না। কিন্তু উপরের আয়াতটা যদি মাথায় থাকে, তাহলে বুঝবেন যে, যত বড় কষ্টই হোক না কেন, ওটা সহ্য করার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা আপনার আছে। আল্লাহ যখন বলেছেন, তিনি আমাদের উপর এমন কোনো বোঝা চাপান না, যা আমরা সহ্য করতে পারব না, তাহলে তা-ই সঠিক। আমার মধ্যে ঐ কষ্ট সহ্য করার সামর্থ্য অবশ্যই আছে। আপনি যখন এভাবে আপনার মনটাকে ঠিক করে নেবেন, তখন দেখবেন, মুহূর্তের মধ্যে মন শান্ত হয়ে যাবে।

কষ্টের পর স্বস্তি আছে
“কষ্টের পর অবশ্যই স্বস্তি আছে। আবার শোনো, কষ্টের পর অবশ্যই স্বস্তি আছে।” (সূরা ইনশিরাহ: ৫)
আল্লাহ তাআলা কথাটা পরপর দুবার বলেছেন। এমনিতে দু’বার বলার দরকার ছিল না। কেননা, আল্লাহ তাআলার কথার কখনো হেরফের হয় না। কিন্তু তিনি দৃঢ়তার জন্য দু’বার বলেছেন। বান্দা যেন আস্থা ও বিশ্বাস রাখে– কষ্টের সাথে স্বস্তি আছেই আছে, দুনিয়ার আর কোনো কিছু তাঁর এই কষ্ট দূর করতে পারবে না।

তাই মন খারাপ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, তখনও আশাহত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, “কষ্টের পর অবশ্যই স্বস্তি আছে।” এখানেই শেষ না। এই কষ্টকর অবস্থাটা যদি ধৈর্য ধরে পার করতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে আল্লাহ তাআলা আপনাকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিবেন। ভালো কিছু উপহার দেবেন।

মুমিনের সবটাই লাভ
মুমিন যদি সুখের মধ্যে থাকে, সেটাও তাঁর জন্যে কল্যাণকর। আবার যদি কষ্টের ভেতরে থাকে, সেটাও তাঁর জন্যে কল্যাণকর। মুমিনের কোনো লস প্রজেক্ট নেই। সবটাই তার লাভ।
“মুমিনের বিষয়টি বড়োই বিস্ময়কর! তাঁর সবকিছুই কল্যাণকর; মুমিন ছাড়া অন্য কারও ক্ষেত্রে সেটি প্রযোজ্য নয়। তাঁর জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি এলে সে কৃতজ্ঞতা আদায় করে। ফলে তা হয় তাঁর জন্য কল্যাণকর। আর দুঃখ-দুর্দশার মুখোমুখি হলে সে ধৈর্যধারণ করে। ফলে তাও হয় তাঁর জন্য কল্যাণকর।” (সহীহ মুসলিম)

আপনার চেয়েও দুঃখী আছে
জীবন পথে চলতে গিয়ে ধাক্কা খেলে ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহর শোকর আদায় করুন। যা তিনি নিয়ে গেছেন, তার বিনিময়ে সওয়াবের আশা রাখুন এবং আশেপাশের লোকজনকে দেখে সান্তনা লাভ করুন। আপনি আশেপাশে তাকিয়ে দেখুন– সব দিকেই দুর্দশাগ্রস্ত ও হতভাগা মানুষের মিছিল। প্রতিটি ঘরেই অশান্তি। প্রতিটি গালেই অশ্রু। কত বিপদ! কত মুসিবত! আপনি দেখবেন, বিপদগ্রস্থ কেবল আপনি একাই নন; বরং অন্য অনেকের তুলনায় আপনার বিপদ সামান্য।

হতাশ হওয়া চলবে না
দুশ্চিন্তা করবেন না। হয়তোবা আপনার পিতা মারা গেছেন। কিন্তু আপনার শোক কাতরতা কি তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে? হয়তোবা আপনি ব্যবসায় মার খেয়েছেন। কিন্তু আপনার বিমর্ষতা কি লোকসানকে লাভে পরিণত করতে পারবে? আপনি এক মুসিবতে দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে, তা আরও মুসিবত ডেকে আনবে। সাময়িক দারিদ্রতায় হতাশ হয়ে পড়লে অবস্থা আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়বে। তাই নিশ্চিন্ত ও প্রফুল্ল থাকুন।

আর কী চাই আপনার?
“অতএব, (হে জীন-ইনসান!) তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে।” (সূরা আর-রহমান: ১৩)
আপনি দুশ্চিন্তা করবেন কেন? আপনার তো ধর্ম ও আকিদা-বিশ্বাসের নেয়ামত আছে। থাকার মত একটি ঘর আছে। খাবার জন্য খাদ্য আছে। পরিধান করার মত কাপড় আছে। সঙ্গ দেওয়া ও মানসিক প্রশান্তির জন্য স্ত্রী আছে। তারপরও আপনার দুশ্চিন্তা কীসের জন্য?

নেয়ামতের সাগরের ডুবুরী
যা হারিয়েছেন তা নিয়ে আফসোস করবেন না। আপনার কাছে আল্লাহর আরও অনেক নেয়ামত আছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন— “যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (সূরা নাহল: ১৮)

তিনি অন্যত্র বলেন— “তোমরা কি দেখ না, আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলে যা কিছু আছে, সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ন করে দিয়েছেন?” (সূরা লোকমান: ২০)

ধৈর্যের পুরষ্কার অপরিমিত
বিপদে-মুসিবতে আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুল করতে পারাটা অনেক বড় একটি নেয়ামত। তাওয়াক্কুলের মধ্যে মনের স্থিরতা, দিলের প্রশান্তি ও অন্তরের নিশ্চিন্ততা রয়েছে। যারা এই মহান গুণের অধিকারী আল্লাহ তাআলা তাদের ভালবাসেন এবং তাদের জন্য রয়েছে অগণিত ও অকল্পনীয় পুরষ্কার।
যারা ধৈর্যধারণকারী, তাদেরকে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে অপরিমিত। (সূরা যুমার: ১০)

সুখের অপেক্ষাও ইবাদত
মনের সুখ-শান্তি আর আত্মার পরিতৃপ্তি অনেক বড় নেয়ামত। এতে মন পরিচ্ছন্ন থাকে। জীবনে বৈচিত্র্য ও উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
পরিস্থিতিকে সহ্য করুন। হতাশ হলে চলবে না। সব ধরণের পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করুন সফলতার সঙ্গে; দৃঢ়তার সাথে। ইমাম তিরমিজি (রহ.) একটা হাদীস বর্ণনা করেছেন– “স্বস্তির জন্য অপেক্ষা করা সর্বোত্তম ইবাদত।”

বিপদের মাঝেও প্রশান্তি

বিপদে আত্মিক প্রশান্তি অর্জনের উপায়—
ক. আল্লাহ তাআলার ফায়সালার প্রতি পূর্ণ ও মজবুত ঈমান। আল্লাহ যা চান, তা-ই হয়। যা তিনি চান না, তা কখনোই ঘটে না।
খ. আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাঁর অনুগত বান্দাদের সাহায্য করেন। আপনাকেও করবেন।
গ. দৃঢ় ও অবিচল থাকা।
ঘ. বেশি বেশি জিকির করা।
ঙ. আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রসূলের অনুগত হওয়া।

ভাবনায় পরিবর্তন আনুন
বহু বিষয় আছে, যেগুলো বিপদকে সহজ করে দেয়। অতএব আপনি সেগুলো নিয়ে ভাবুন। উদাহরণস্বরূপ–

ক. আল্লাহ তাআলা বিপদের বিনিময়ে সওয়াব ও প্রতিদান দান করবেন।
খ. আপনি ছাড়া আরও বহু মানুষ বিপদে জর্জরিত রয়েছে। আপনার ডানে-বামে তাকিয়ে দেখুন, সবখানেই দুর্দশাগ্রস্তদের আহাজারি।
গ. এ বিপদ সামান্যই। এর চাইতেও বড় বিপদ আসতে পারত। কিন্তু তা আসে নি।
ঘ. এ বিপদ বান্দার দুনিয়াবি বিষয়ে; ধর্মীয় বিষয়ে নয়।
ঙ. বিপদ সত্ত্বেও ধৈর্যধারণ করা ও তাকদীরের উপর সন্তুষ্ট থাকা দাসত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
চ. তাকদীরে যা লেখা আছে, তা প্রতিহত করার কোনো সুযোগ নেই। অতএব ধৈর্য ধারণ করুন।
ছ. সম্পূর্ণ এখতিয়ার আল্লাহর হাতে।
“তোমাদের কাছে হয়তো একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।”  (সূরা বাকারা: ২১৬)

পরিস্থিতিকে সহজভাবে নিন
বিপদ-আপদ, বালা-মুসিবত কিংবা জটিল কোন পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে যাবেন না। বরং তখন নিজেকে প্রশ্ন করুন—
ক. পরিস্থিতি এর চাইতেও আর কত খারাপ হতে পারে?
খ. নিজেকে সে জন্য প্রস্তুত করুন।
গ. তারপর ঠান্ডা মাথায় তা মোকাবিলা করার জন্য মনোযোগী হোন।

আ’মালে সালেহ করুন
“মু’মিন হয়ে পুরুষ ও নারীর যে কেউ নেক আমল করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই আনন্দময় জীবন দান করবো এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করবো।” (সূরা নাহল; ১৬:৯৭)

পূর্বের তুলনায় নেক আমল বাড়িয়ে দিন। কারণ, আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন– নেক আমলের প্রতিদানে আপনার জীবনকে আনন্দময় করে দিবেন। বাহ্যিক বিপদেও আপনি প্রশান্ত থাকবেন। সুখী হবেন।

গুনাহমুক্ত জীবনে গড়ুন
“কঠিন শাস্তির পূর্বে আমি তাদেরকে হালকা শাস্তি আস্বাদন করাবো, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।” (সূরা সাজদাহ: ২১)

আল্লাহ তাআলা আপনাকে ভালোবেসে সৃষ্টি করেছেন। তিনি চান আপনি তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে জান্নাতের পথিক হোন। কিন্তু আপনি তাকে ভুলে গিয়ে দেহমনের পাপাচারে ডুবে আছেন। জাহান্নামের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছেন। তাই তিনি আপনাকে বিপদ দিয়ে সতর্ক বার্তা দিচ্ছেন— প্রিয় বান্দা, গুনাহ ছাড়ো। আনুগত্যের পথে ফিরে আসো। কল্যানময় জীবন গড়ো।

কল্যাণের পথে অগ্রসর হোন
নিজেকে সবসময় ভাল কাজে ব্যস্ত রাখা বা কল্যাণকর জ্ঞান অর্জনে আত্মনিয়োগ করুন। এতে করে মনের ভেতর দুশ্চিন্তা আর ঠাঁই পাবেনা। ফলে ভাবনার জগতেও পরিবর্তন আসবে। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা সৃষ্টিকারী ভাবনাগুলো মন থেকে বিদায় নেবে। মনে সুখ ফিরে আসবে। মনোবল দৃঢ় হবে।

দেখুন, বিপদ চলে যাচ্ছে
আবান ইবনে তাগলাব বলেছেন— “আমি এক মরুবাসী আরবকে বলতে শুনেছি, তিনি বলছিলেন– মানুষের সর্বোত্তম গুণ-বৈশিষ্ট্যের একটি হচ্ছে এই যে, যখন সে কোনো মসিবতে পড়বে তখন ধৈর্য্য ধারণ করবে। নিজেকে নিজে এই প্রবোধ দিবে যে, এ বিপদ এক সময় কেটে যাবে। আর তা হবে এমন দৃঢ়তা ও বিশ্বাসের সঙ্গে, যেন সে বিপদ থেকে মুক্তি নিজ চোখে দেখছে। আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করবে। তাঁর প্রতি সু-ধারণা পোষণ করবে। একজন মানুষের ভিতরে যখন এ অবস্থা সৃষ্টি হয়ে যাবে, তখন অনতিবিলম্বে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রয়োজন পূরণ করবেন। তাঁর দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। তাঁর দীন-ধর্ম ও সম্মান-মর্যাদা হেফাজত করবেন।”

সূর্যি মামা হাসবেই
আপনার বিপদের ফায়সালা যিনি করেছেন, তিনি প্রজ্ঞাময় ও দয়ালু। তিনি যা ইচ্ছা, তা-ই করেন এবং যা চান, তা-ই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বান্দার ওপর তাঁর দয়া ও রহমত বিভিন্নভাবে পরিব্যপ্ত হয়ে আছে।

আপনার চারপাশে যতই বিপদ আসুক, কষ্ট-যন্ত্রনার ঘন কুয়াশা যতই ঘনিয়ে আসুক,, দুঃখ-দুর্দশার অন্ধকার যতই ছেয়ে যাক; সূর্যের হাসি একসময় প্রকাশিত হবেই। আপনার দুঃসময় কাটবেই। ইনশাআল্লাহ।


সহায়ক গ্রন্থাবলী:
১. হতাশ হবেন না। ড. আয়েয আল করনী।
২. জীবন যেভাবে সুখের হয়। মুফতী রশিদ আহমদ রহ.।
৩. সমস্যার সমাধান। আব্দুল মালিক আল-কাসিম।
৪. ইসলামী মনোবিজ্ঞান। মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন।
৫. যে জীবন মরীচিকা। আব্দুল মালিক আল-কাসিম।
৬. তুমি ফিরবে বলে। জাকারিয়া মাসুদ।

বিজ্ঞাপন

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: