কওমী শিক্ষাব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে কোরবানীর আগেই সীমিত আকারে কওমী মাদরাসাগুলো খুলে দেয়া হোক

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী


১.
জনগণের দেয়া ভ্যাট, ট্যাক্স, ব্যাংকঋণ, টোল, শুল্ক, আবগারী, হাসিল, বিভিন্ন ফি,খাজনা ইত্যাদি রাজস্ব ছাড়া যেমন রাষ্ট্র-সরকার চলেনা, তেমনি জনগণের সহায়তা ছাড়া কওমী মাদরাসা চলেনা। দীর্ঘ দিন ধরে মাদরাসা বন্ধ। বেতন ভাতা বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্টরা সমস্যায় পড়ে আছেন। হেফজখানা মক্তব ও প্রাইভেট মাদরাসা বন্ধ থাকায় ছাত্রদের পড়াশোনার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত মাদরাসা কর্তৃপক্ষ মহাবিপদে আছেন। সবার বিপদ ও অসুবিধা নেতৃবৃন্দের অনুভব করতে হবে। সহানুভূতি প্রকাশ ও সর্বোচ্চ সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে। এসবের তথ্য ও ডাটা সংগ্রহ করে কওমী মাদরাসা ও সংশ্লিষ্ট আলেমদের সাথে যোগাযোগ এবং গভীর সম্পর্কের মাধ্যমে এই কম্যিউনিটির যত্ন ও উন্নয়নই মূলত বেফাক ও অন্যান্য বোর্ডের নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠিত বড়ো মাদরাসা ও অধিক রিজিক, তাওফীক ও সম্মানপ্রাপ্ত বুযুর্গ আলেমগণেরও এটি ধর্মীয় মানবিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব।

২.
বড়ো মাদরাসাগুলো রমজানের আয় থেকে বঞ্চিত। শাওয়াল মাসে মাদরাসা শিক্ষার বর্ষ শুরু হয়েছে। কিন্তু পড়ালেখা শুরু করা যায়নি। অনেক ছাত্র পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী হলেও পরিবারের পেছনে সময় দিতে বাধ্য হওয়ায় আর্থিক সংকটে তাদের পড়ালেখা ছেড়ে দিতে হচ্ছে। বিগত ৪০ বছরের উদ্বৃত্ত আয়, ছাত্রদের দেয়া কল্যান চাঁদা, সব ধরণের মানুষ থেকে সহায়তা নিয়ে মোটামুটি ৫০০ কোটি টাকার ‘কওমী কল্যাণ তহবিল’ গঠন করে বিপন্ন আলেম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তা ও কর্জে হাসানের একটা উপায় বের করতে হবে। নিজ পরিবার ও বংশধরের মতোই আল্লাহর নবী স. এর এই মেহমানদের জন্যও নেতৃস্থানীয় উলামা মাশায়েখকে চিন্তা অবদান ও ভূমিকা রাখতে হবে।

৩.
সামনে কোরবানি ঈদ। এখনই সীমিত আকারে মাদরাসা খোলা উচিৎ। কারণ, সারাদেশে মানুষের কোরবানি সহি শুদ্ধ হওয়ার জন্য মাদরাসার সহযোগিতা দরকার। পাড়া মহল্লায় কোরবানিদাতার পাশাপাশি ইমাম,আলেম,মাদরাসা শিক্ষার্থীদের হাতেই পশু জবাই হয়ে থাকে। এর আগে পরে কোরবানির জরুরি মাসআলার জন্যও এই সেবাদাতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষ উপকৃত হয়ে থাকেন।

৪.
কোরবানির চামড়া অথবা এর মূল্য মানুষ সমাজের অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত, অনাথ, এতিমদের দিয়ে থাকেন। এমন অবস্থায় থাকা যারা মাদরাসার আশ্রয়ে জীবনযাপন ও লেখাপড়া করে তারা অন্য যে কোনো শ্রেণির চেয়ে কোরবানির চামড়ার বেশি হকদার। গত বছরের দুঃখজনক চামড়া কেলেংকারীর ক্ষতি পুষিয়ে দিতে কওমী উলামায়ে কেরামের এ সংকট মুহূর্তে আশা করি সরকার নিজের আন্তরিকতা, সক্ষমতা ও সদিচ্ছার প্রমাণ দিবে।

৫.
অতএব, কোরবানির আগেই ঈদের জামাত ও কোরবানির খেদমতের জন্য প্রতিটি মাদরাসার কর্তৃপক্ষকে জরুরি সংখ্যক ছাত্র শিক্ষক নিয়ে মাদরাসা খোলার অনুমতি দেয়া হোক। আর ঈদের পর ভারসাম্যপূর্ণ স্বাস্থ্য সুরক্ষা নীতি অনুসরণ করে চলার শর্তে দেশের সব কওমী মাদরাসা খোলা হোক। এক্ষেত্রে চলমান অনিশ্চয়তা ও সামগ্রিক অচলাবস্থা দূর করতে কওমী উলামায়ে কেরামের সাহসী ভূমিকার বিকল্প দেখছিনা।

৬.
এবিষয়ে মাদরাসা বোর্ড ও নেতৃত্বদানকারী কওমী উলামায়ে কেরামের সাহসী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে দীনি ও শরঈ নির্দেশনা এবং কওমী মাদরাসার ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা অনুযায়ী অগ্রসর হতে হবে। সরকারের সাথে যাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তারা এবিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করি। সংশ্লিষ্টরা এ যোগাযোগের সুবিধাগুলো ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না করে কওমী অঙ্গনের প্রয়োজনে ব্যবহার করে ইতিহাসে ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।

৭.
যারা কওমী মাদরাসার ছয় বোর্ডের সম্মিলিত কর্তৃপক্ষ আল হাইয়া, বিশেষ করে বেফাকের নেতৃত্বে আছেন, আশা করি হিফজ করার অতুলনীয় পদ্ধতি জিন্দা রাখা, সব ধরণের কওমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং এর সাথে যুক্ত আলেম হাফেজ ও সহযোগী কর্মশক্তিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সীমিত আকারে হলেও অবিলম্বে কওমী মাদরাসা খোলার ব্যাপারে আরো সক্রিয় ভূমিকা রেখে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করবেন।


চেয়ারম্যান ও মহাপরিচালক, ঢাকা সেন্টার ফর দাওয়াহ এন্ড কালচার

বিজ্ঞাপন

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: