করোনাকালে মানসিক সুস্থতা ও ইসলাম

আবু জোবায়ের


করোনা ভাইরাস শারীরিক সমস্যা ও মৃত্যু ঝুঁকির সাথে তৈরি করছে মানসিক অশান্তি ও অস্থিরতা। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার কারণ হচ্ছে– মৃত্যুভীতি, শারীরিক উপসর্গের ভয়। রোগীর প্রতি সামাজিক বিরূপ আচরণ কিংবা পরিবার থেকে দূরে থেকে একাকি জীবন যাপনও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

অন্যদিকে করোনা আক্রান্তহীন বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মানসিক সংকটের কারণ হচ্ছে– করোনা ভীতি, চলমান নাগরিক জীবনের হঠাৎ স্থবিরতা ও সাময়িক বন্দি জীবন, অর্থনৈতিক সমস্যা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা ,অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, স্থবির জীবনে পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অস্থিরতা ইত্যাদি।


সুতরাং করোনায় নানান সমস্যার জড়াজড়িতে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন। অথচ এ রোগে দুর্বলদের জন্য ঝুঁকি বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের মানসিক সুস্থতা ও দৃঢ়তার জন্য ইসলামের আলোকে মনোস্তাত্তিক সমাধান হলো—

১.
কিছু দিন আপনি সুখী এবং কিছু দিন আপনি দুঃখী । এ-ই জীবন! জীবনে সুখের সাথে দুঃখও থাকবে। তবে সুখ যেমন চিরস্থায়ী নয়, তেমন দুঃখটাও কিন্তু আজীবন থাকবে না। কাজেই দুঃখে-দুঃখে নিজেকে শেষ করার কোনো মানে নেই। সবসময় ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়ুন।

২.
করোনা কে আল্লাহর নেয়ামত মনে করুন। কারণ, একজন মুসলিম রোগাক্রান্ত হলে তাঁর গুনাহ মাফ হয়। আল্লাহর কাছে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। করোনাকে এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গ্রহণ করলে সবর করা সহজ হবে। অনর্থক দুশ্চিন্তা আসবে না এবং মনোকষ্টে ভুগবেন না।
হাদীসে এসেছে—  ‘কোন মুসলমানের রোগ, বিপদ ইত্যাদিতে কোন কষ্ট হলে তার কারণে আল্লাহ তাআলা তার পাপরাশি ঝরিয়ে দেন, যেমন বৃক্ষ তার পাতা ঝরিয়ে দেয়।’  (বুখারী ও মুসলিম)

৩.
বিশ্বাস রাখুন, রোগ-ব্যাধিতে একমাত্র আরোগ্যদানকারী মহান আল্লাহ। তিনি ছাড়া অন্য কেউ রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে না। তিনিই আপনাকে সুস্থতা দান করবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “(ইবরাহীম আ. বললেন) যখন আমি অসুস্থ হই তখন তিনিই আমাকে সুস্থতা দান করেন।” [সূরা শুয়ারা: ৮০]

হাত প্রসারিত করুন, আঁচল বিছিয়ে দিন এবং বেশি বেশি তাঁর কাছে প্রার্থনা করুন। সাহায্য কামনা করুন। তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের অন্বেষী হোন। তাঁর প্রতি সু-ধারণা পোষণ করুন। আপনি ব্যর্থ মনোরথ হবেন না।

৪.
বেশি বেশি ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল’ অর্থাৎ “আল্লাহ তাআলাই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক”– দুআটি পড়ুন। রোগাক্রান্ত অবস্থায় সাধারণত মানুষ তার মৃত্যু নিয়ে শঙ্কিত হয় এজন্য যে, মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে তার অসহায় স্ত্রী, সন্তান ও পরিজনের দিনকাল কেমন কাটবে? সন্তানাদি স্বাবলম্বী হলে কিংবা তাদের জন্য বিশ্বস্ত কোনো অভিভাবক থাকলে সাধারণত চিন্তাটা কম থাকে। বস্তুতঃ মানুষের উত্তম অভিভাবক হলেন আল্লাহ তাআলা। এই দুআটি পড়ুন এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস রাখুন—  তিনিই আপনার পরিবারের জন্য উত্তম অভিভাবক এবং তিনিই যথেষ্ট।

৫.
আপনি ধৈর্য হারাবেন না। এ-বিপদ যত কঠিনই হোক না কেন। কারণ, ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই আসবে। প্রতিটি কষ্টের পরে সুখ আছে। প্রতিটি বিপদের পরে শান্তি আছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন— “নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।” (সূরা ইনশিরাহ: ৫)

৬.
ভবিষ্যতে কি হবে, তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বর্তমান মুহূর্তগুলোকে কী করে অর্থপূর্ণ এবং সার্থক করে তোলা যায় তার প্রতি অধিক মনোযোগ দিন। প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতেন যেন “অতীতে কী হয়েছে বা ভবিষ্যতে কী হবে” এধরনের ভাবনা বা দুশ্চিন্তা তাঁর মধ্যে সৃষ্টি না হয়। কারণ, অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ, দুইয়ের কোনোটিই মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয় নয়। তাই এই মুহূর্তে কী করছি, ঠিক করছি না ভুল করছি, এটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর এভাবে যদি বর্তমানকে নিয়ে ভাবা যায় তাহলে বর্তমানসহ ভবিষ্যতও সুন্দর হয়ে উঠবে। মনে দুশ্চিন্তাও আর ঠাঁই পাবেনা।

৭.
মানসিক পরিতৃপ্তি এবং হৃদয়ের প্রশান্তি লাভের অন্যতম উপায় হল– আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করা। মহান প্রতিপালক আল্লাহ তাআলাকে স্মরণের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি এবং আন্তরিক পরিতৃপ্তি অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন— “নিশ্চয় আল্লাহর যিক্‌র-এ অন্তর প্রশান্ত হয়।” (সূরা আল রা’দ: ২৮)

৮.
আল্লাহ তাআলা বলেছেন— “তখন তাদের (মৃত্যুর) নির্ধারিত সময় এসে যাবে, তখন তাঁরা এক মুহুর্তও আগ-পিছ করতে পারবে না। (সূরা আ’রাফ: ৩৪)

সুতরাং মৃত্যুর পূর্বেই মারা যাওয়ার দরকার নেই। কারণ, মৃত্যুর জন্য একটি সময় নির্ধারিত আছে, যাতে বিন্দুমাত্রও অগ্র-পশ্চাত হবে না। কাজেই আপনি আপনার নির্ধারিত সময়েই মৃত্যুবরণ করবেন, তাঁর আগে নয়।

৯.
করোনায় মৃত্যুকে খারাপ মনে করবেন না। বরং ভালো মনে করুন। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মহামারীতে মৃত্যু হওয়া প্রতিটি মুসলিমের জন্য শাহাদাত।” (বুখারী শরীফ)

বিজ্ঞাপন

এছাড়া মৃত্যু দ্বারা পাপ থেকে রক্ষা ও পৃথিবীর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য ও দ্রুত জান্নাত লাভ হয়। হাদীসে এসেছে—  “মুসলিম বান্দা (মৃত্যু দ্বারা) দুনিয়ার কষ্ট-ক্লেশ থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে আল্লাহর রহমতের দিকে উপনীত হয়।”  (বুখারী ও মুসলিম) বস্তুতঃ মৃত্যু মুমিনের নিকট সব কিছু হারানোর বিভীষিকা নয় বরং সব কিছু পাওয়ার উন্মুক্ত দুয়ার।

১০.
মানসিকভাবে নিজেকে উজ্জীবিত রাখুন, প্রাণ খুলে হাসুন। পরিবর্তিত জীবনে নতুন স্বাস্থ্যকর দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করুন। ইসলামচর্চা করুন। নামাজ পড়ুন। কুরআন পড়ুন। পরিবারের সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় দিন। ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম ও সুষম পুষ্টিকর খাবার মানসিক ভাবে আপনাকে চাঙ্গা রাখবে। দৈনিক হালকা ব্যায়াম করুন।  আয় ও ব্যায়ের মাঝে সামঞ্জস্যতা বজায় রাখুন। আত্মীয় -স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সাথে ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।

সবশেষে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন–‘করোনা রোগী থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।’ কিন্তু এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকার মানসিকতা যেন কাছের মানুষটিকে একাকীত্ব ও হতাশায় না ফেলে সেদিকেও বিশেষ লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। নিয়মিত তার খোঁজখবর নেওয়া, আশ্বাস দেওয়া এবং সহযোগিতা করা প্রয়োজন। আমাদের এই মানবিক আচরণটিই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের মনোবল শতগুণ বাড়িয়ে দেবে।

শিক্ষার্থী: হাটহাজারী মাদ্রাসা

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: