শিরোনাম
স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৪ অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে ওমরাহ পালনের অনুমতি দেবে সৌদিআরব অবশেষে ৩ অক্টোবর পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন বেফাকের বিতর্কিত মহাসচিব আবদুল কুদ্দুস ৭১ টিভিতে আমাকে জড়িয়ে জঘন্য মিথ্যাচার করা হয়েছে; ক্ষমা না চাইলে মামলা করব : কারী রিজওয়ান আরমান জাতিসংঘের কি আদৌ প্রয়োজন আছে? সীমান্ত এলাকাকে আবারো অশান্ত করছে মিয়ানমার সমস্ত শয়তানি কার্যক্রমের উৎস হচ্ছে ইসরাইল-আমেরিকা: হুথি আনসারুল্লাহ হাটহাজারীতে আল্লামা আহমদ শফীকে কটূক্তি; শীর্ষ আলেমদের উদ্যোগে করা হচ্ছে মামলা ভারতের সঙ্গে কষ্টে গড়া সম্পর্ক ছোট্ট পেঁয়াজে নষ্ট হচ্ছে: সংসদীয় কমিটি ২১শে ফেব্রুয়ারি নয়, পশ্চিমবঙ্গে নতুন মাতৃভাষা দিবস চালুর চেষ্টায় বিজেপি আল্লামা আহমদ শফী রহ. -এর মাগফিরাত কামনায় রংপুরে দোয়া-মাহফিল অনুষ্ঠিত
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:২৯ পূর্বাহ্ন
add

করোনা কেন্দ্রিক গুজব; মিথ্যা ও গুজব রটে গেলে আমাদের করণীয় কী?

কওমি ভিশন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০
add

আবু জোবায়ের


করোনা মুক্তির গুজব: বাঁচবেন কীভাবে?

প্রযুক্তির উন্নয়ন মানুষের জীবনকে সহজ ও সাবলীল করেছে। গোটা মানব সমাজকে গতিশীল করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তথ্যের অবাধ প্রবাহ মানুষকে বিভ্রান্তও করছে। মানুষ স্বার্থ হাসিলের জন্য সমাজে ভুল ও মিথ্যা কিংবা আংশিক মিথ্যা ছড়িয়ে দিচ্ছে। সমাজে ভয়ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। গুজব ও মিথ্যার এই সয়লাব দিন দিন বাড়ছেই।

গুজব মানেই রটনা, যার কোন ভিত্তি নেই। মূলত মানুষের মুখে মুখে এটি বেগবান হয়। ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে। অনেক সময় গুজবের দাবানলে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা। কখনও কেড়ে নেয় মানুষের প্রাণ।

গুজব প্রথম কে ছড়ায়- প্রায় ক্ষেত্রেই তার কোন হদিস পাওয়া যায় না। মোবাইল ও ইন্টারনেটের যুগে গুজব ছড়ানো খুবই সহজ। আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ব্লগগুলোয় গুজব ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনা অহরহই ঘটছে।

গুজব একটি নিন্দনীয় কাজ। ইসলামের দৃষ্টিতে গুজবে কান দেয়া ও তা ছড়ানো দুটোই অপরাধ। ইসলাম গুজব প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তা মেনে চললে গুজবের বিভ্রান্তি ও বিসৃঙ্খলা থেকে সহজেই বেঁচে থাকা যাবে। কুরআন ও হাদিস থেকে কয়েকটি নির্দেশনা উল্লেখ করছি—

১. বাক সংযমী হোন:

বাচালতা থেকে বাঁচুন। খুব সীমিত কথা বলুন। চিন্তা-ভাবনা করে কথা বলুন। প্রয়োজনে কথা বলুন। বেহুদা, বানোয়াট ও অপ্রয়োজনীয় কথোপকথন ইসলামে পছন্দনীয় নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায়।’ (তিরমিজি : ২৫০১)
তিনি অন্যত্র বলেন, ‘মানুষ চিন্তা-ভাবনা না ক‘রে এমন কথাবার্তা বলে ফেলে, যার দ্বারা তার পদস্খলন ঘটে পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যবর্তী দূরত্ব থেকে বেশি দূরত্ব দোযখে গিয়ে পতিত হয়।’ (রিয়াদুস সলেহিন: ১৫২২)

আমাদের পারষ্পরিক গল্প ও আড্ডার পুরোটা সময় জুড়ে থাকে  মিথ্যা, পরনিন্দা ও কাল্পনিক সব কথাবার্তা। এগুলো ছাড়া আমাদের বৈঠকই জমে না। অথচ আল্লাহ তা’আলা বলেন,
‘তোমরা পরস্পরের দোষচর্চা কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা অপছন্দ করবে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (সূরা হুজুরাত: ১২)

২. মিথ্যাকে ‘না’ বলুন:

মিথ্যা বলা মহাপাপ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মিথ্যা বলা সবার কাছেই ঘৃণিত কাজ। তবুও মিথ্যার মাধ্যমে ধোঁকাবাজি প্রতিনিয়ত চলছেই। মিথ্যাকে ‘না’ বলুন। অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে মিথ্যা বলার ওপর হুঁশিয়ারি এসেছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘মিথ্যাবাদীদের উপর অভিসম্পাত।’ (সূরা আল-ইমরান: ৬১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষ যখন মিথ্যা কথা বলে, তখন মিথ্যার দুর্গন্ধে ফেরেশতারা মিথ্যাবাদী থেকে এক মাইল দূরে চলে যায়।’ (তিরমিজি: ১৯৭২)

৩. কান কথায় কান দিবেন না:

‘চিলে কান নিল’ বলে অযথা চিলের পেছনে দৌড়ানো বাঙালিদের স্বভাব। অথচ হাত দিয়ে একবারও কানটা ধরে দেখা হয় না আসলেই কান নিয়েছে কিনা। এটাকে বলে ‘কানকথা’ বা ‘শোনা কথা’। ‘কোনো কথা শুনেই বলে বেড়ানো’ হাদিসের ভাষায় এটাকেও মিথ্যা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কারও কাছে কোনো কথা শুনামাত্রই তা বলে বেড়ানো মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ (মুসলিম: ৯৯৬)

হাদিসবিশারদরা এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, কোনো কথা শুনেই প্রচারের প্রবণতা মানুষকে মিথ্যায় লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়। ফলে সে পৃথিবীতে লজ্জিত হয় এবং পরকালেও তার জন্য রয়েছে শাস্তির বিধান।

৪. সংবাদ যাচাই করুন:

কোনো সংবাদ শুনলে অবশ্যই তা যাচাই করুন। সংবাদটা কে দিচ্ছে, সে কোন মাধ্যমে তা জেনেছে এবং সে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি কি-না, ইত্যাদি না জেনেই তা বিশ্বাস করবেন না। কয়েকদিন আগে আমার মেসেঞ্জারে একজন মেসেজ পাঠিয়েছে—  ‘মদিনা শরীফে ১ লাখ হাজী স্বপ্নে দেখেছেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছে, আমার উম্মতকে বলে দিও তারা যেনো কুরআন তিলওয়াত করে  এবং নামাজের তাগিদ দেয়। এই sms যারা ২০ জনকে দিবে তারা ৯ দিনের মধ্যে কোন খুশির খবর শুনবে। যারা দিবে না, তাদের আশা ১৫ বছরেও পূরন হবে না। এটা সত্য।’

এই মেজেসটা যে একেবারেই ভুয়া ও ভিত্তিহীন তা একটু ভেবে দেখলেই বুঝা যায়। এখন না হজের সময় আর না ১ লক্ষ হাজী থেকে জানা সম্ভব যে, তারা আসলেই স্বপ্নটা দেখেছে কি-না। এ জাতীয় মেসেজ প্রায়ই আমাদের ফোনে আসে এবং আমরা তা নির্দ্বিধায়, নির্বিচারে শেয়ার করি।

ইসলামের নির্দেশনা হলো, সংবাদ প্রচারের আগে অবশ্যই তা যাচাই করে নিতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের কাছে যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো। অজ্ঞতাবশত কোনো গোষ্ঠীকে আক্রান্ত করার আগেই, (না হলে) তোমরা কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ (সূরা হুজুরাত: ৬)

৫. অজানা বিষয়ের পেছনে পড়বেন না:

একজন মানুষের সব বিষয়ের জ্ঞান না থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই যে বিষয়টি আপনার জানা নেই, সে বিষয়ের পেছনে পড়বেন না। পণ্ডিতি দেখাতে না গিয়ে বরং চুপ থাকুন। তাহলে কেউ আপনার থেকে ভুল কিছু জানবে না এবং সমাজে ভুল কিছু ছড়াবে না। কারণ, আপনি প্রতিটি কর্মের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ, অন্তরের প্রতিটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে।’   (সূরা বনি ইসরাঈল : ৩৬)

৬. বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের পরিত্যাগ করুন :

গুজব ছড়ানোর পেছনে প্রধান উদ্দেশ্যই থাকে মানুষকে বিভ্রান্ত করা। তাদের চিন্তা-চেতনা উল্টো দিকে ফিরিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করা। অনেকে ফেসবুকে ও ইউটিউবে আজগুবি বিভিন্ন কিছু প্রচার করে, যাতে তাদের লাইক, কমেন্ট ও ভিউ বাড়ে। তাই আজগুবি কিছু শুনলেই বিশ্বাস করা যাবে না; বরং যারা এসব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে তাদেরকে পরিত্যাগ করুন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তারা তোমাদের সঙ্গে বের হতো, তবে শুধু বিভ্রান্তিই বৃদ্ধি পেত। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য তারা তোমাদের ভেতর ছোটাছুটি করত। তোমাদের ভেতর তাদের কথা শোনার (বিশ্বাস করার) লোক রয়েছে। আল্লাহ অত্যাচারীদের সম্পর্কে অবগত আছেন।’ (সূরা তাওবা : ৪৭)

৭. শয়তানের সহযোগী হবেন না:

শয়তান মানুষের চিরশত্রু। সে কখনো মানুষের কল্যাণ চায় না। এজন্য সে মানুষদের মাঝে গুজব ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাদের অপরাধে লিপ্ত করে। বেশ কিছুদিন আগে একটি গুজব ছড়েছিল— পদ্মা সেতুর জন্য মানুষের মাথা লাগবে। এই গুজবের কারণে বেশ কিছু জায়গায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। অথচ একজন মানুষকে মেরে ফেলা ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ।

এছাড়াও শয়তান গুজব ছড়িয়ে মানুষদেরকে আল্লাহর ইবাদত থেকে গাফেল রাখে এবং তাদেরকে সহীহ আমলের পরিবর্তে বিদ’আতে লিপ্ত করে। করোনা ভাইরাস ছড়ানোর পর হক্কানী উলামায়ে কেরাম নির্দেশিত দু’আ, আমল ও করণীয় থেকে মানুষদের দৃষ্টি সরাতে নানা গুজব ছড়ানো হয়েছে। কিন্তু কেউ জানেনা এগুলো কে ছড়িয়েছে এবং কোথা থেকে ছড়েছে। তাই কখনো গুজব ছড়িয়ে শয়তানের সহযোগী হবেন না।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শয়তান মানুষের আকার ধারণ করে লোকের কাছে আসে এবং তাদের মধ্যে মিথ্যা কথা প্রচার করে। ফলে তারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্য হতে কোনো লোক বলে ওঠে যে, আমি এক ব্যক্তির কাছে এরূপ বলতে শুনেছি, তার চেহারা দেখলে চিনি, কিন্তু তার নাম বলতে পারি না।’ (মুসলিম শরীফ)

৮. প্রতিটি বিষয় তার দায়িত্বশীলদের জন্য ছেড়ে দিন:

আপনি কোনো বিষয়ে গুজব জাতীয় কিছু শুনলে সে বিষয়ের দায়িত্বশীলদের সাথে পরামর্শ করুন। তাদেরকে অবহিত করে তার সত্যতা ও যথার্থতা নিশ্চিত করুন। এটি না করে গুজবে মাঝে ডুবে যাবেন না। নিজের বিশ্বাসকে ঠুনকো প্রমাণিত করবেন না।
আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের কাছে নিরাপত্তা বা ভয়ের কোনো সংবাদ পৌঁছে, তখন তারা তা প্রচার করে। যদি তারা তা (সংবাদটি) রাসুল বা তাদের দায়িত্বশীল ব্যক্তির দৃষ্টিগোচর করত, তবে তাদের অনুসন্ধানকারীরা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত না থাকত, তবে সামান্যসংখ্যক ব্যতীত সবাই শয়তানের অনুসরণ করত।’ (সূরা নিসা : ৮৩)

সুতরাং আপনি যা শুনেছেন তা যাচাই করুন। মুখের কথাকে সংযত করুন। আপনি কী বলছেন তা নিয়ে সচেতন থাকুন। আপনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো তথ্য বা বার্তা শেয়ারের ক্ষেত্রে সচেতন থাকুন। ভুল তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন। মনে রাখবেন, আল্লাহ তা’আলা আপনাকে দেখছেন। একদিন তার সামনে দাঁড়াতে হবে এবং প্রতিটি কর্মের হিসাব দিতে হবে।

তরুণ লেখক, শিক্ষার্থী : হাটহাজারী মাদ্রাসা। 

Leave a comment

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: