শিরোনাম
স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৪ অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে ওমরাহ পালনের অনুমতি দেবে সৌদিআরব অবশেষে ৩ অক্টোবর পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন বেফাকের বিতর্কিত মহাসচিব আবদুল কুদ্দুস ৭১ টিভিতে আমাকে জড়িয়ে জঘন্য মিথ্যাচার করা হয়েছে; ক্ষমা না চাইলে মামলা করব : কারী রিজওয়ান আরমান জাতিসংঘের কি আদৌ প্রয়োজন আছে? সীমান্ত এলাকাকে আবারো অশান্ত করছে মিয়ানমার সমস্ত শয়তানি কার্যক্রমের উৎস হচ্ছে ইসরাইল-আমেরিকা: হুথি আনসারুল্লাহ হাটহাজারীতে আল্লামা আহমদ শফীকে কটূক্তি; শীর্ষ আলেমদের উদ্যোগে করা হচ্ছে মামলা ভারতের সঙ্গে কষ্টে গড়া সম্পর্ক ছোট্ট পেঁয়াজে নষ্ট হচ্ছে: সংসদীয় কমিটি ২১শে ফেব্রুয়ারি নয়, পশ্চিমবঙ্গে নতুন মাতৃভাষা দিবস চালুর চেষ্টায় বিজেপি আল্লামা আহমদ শফী রহ. -এর মাগফিরাত কামনায় রংপুরে দোয়া-মাহফিল অনুষ্ঠিত
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:৪৬ পূর্বাহ্ন
add

করোনা নিয়ে ভ্রান্তিবিলাস; ধর্মের সঠিক জ্ঞান না থাকার ফল

কওমি ভিশন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২০
add

আবু জুবায়ের


করোনা ভাইরাস ক্রমেই বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪০ জন। এবং ইতোমধ্যেই চারজন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। দেশের এই উদ্ভূত পরিস্থিতির সামাল দিতে সরকার প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সর্বদাই সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলছে।

কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, করোনার মহামারী রূপ দেখার পরও অনেক মানুষ অসতর্ক ও বেপোরোয়া চলাফেরা করছে। সরকার, ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞদের দিকনির্দেশনার কোনো তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না। বরং করোনা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে কিংবা হোম কোয়ারেন্টিনকে দেখার মরণপণ লড়াইয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। লকডাউনকে দেখার জন্য উৎসুক জনতার ভিড় জমেছে। বিদেশ ফেরতরা শাহী মেজাজে বিয়েশাদী করছে; বিপদজনক ঘুরাফেরা করছে। কোনোভাবেই যেন এরা থামছে না।

♦ এই অসতর্কতার নেপথ্যে কী চলছে?
এই যে এখনো অনেক মানুষ, যারা মহামারী নিয়ে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়ে সীমালঙ্গন ও বাড়াবাড়ি করছে, তারা কেনো এসব করছে?! দেখা গেছে— করোনার প্রাদুর্ভাব ঘটার পর থেকেই কিছু ভ্রান্ত ধারণা, বিশ্বাস ও গুজব আমাদের মাঝে প্রভাব বিস্তার করেছে। আর এগুলো আমাদের পরিস্থিতির উল্টো দিকে হাঁটতে অনেকটাই সাহস যোগাচ্ছে। কয়েকটি বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

১. করোনা জালিম কাফিরদের জন্য:
মাহফিলের মঞ্চে গলাবাজ বক্তাদের থেকে এ জাতীয় কথা বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হয়েছে। করোনা এসেছে ইসলামের শত্রুদের ধ্বংস করার জন্য; এর দ্বারা কোনো মুসলমান আক্রান্ত হবে না। অথচ মুসা আলাইহিস সালামের সময়ে কিছু উম্মতের ব্যভিচারের কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেমে আসা ‘তাউন’ মহামারিতে সত্তর হাজার লোক মারা গিয়েছিল বলে বর্ণনায় পাওয়া যায়। এদের সবাই কিন্তু নাফরমান ছিল না; খাঁটি ইমানদারও ছিল অনেক।
তাই এই দুর্যোগের জন্য অন্যকে দোষী না করে চলুন নিজেকে দোষী বানাই। নিজের দিকে তাকাই, আমি নিজেই তো আল্লাহ তায়ালার অনেক নাফরমানিতে নিমগ্ন আছি। কাফিরদের অনুসরণে নিজের লাইফস্টাইল বানিয়েছি। তাই আসুন, নিজের পাপের জন্য আল্লাহর কাছে তওবাহ করি।

২. সংক্রমণ বা ছোঁয়াচে বলতে কিছু নেই:
‘ইসলামে সংক্রমণ বলে কিছু নেই’ কথাটি সময় সচেতন নন এবং গভীর জানাশোনা নেই এমন অনেক আলেমদের থেকেই জনসাধারণের সামনে এসেছে। ফলে অনেকেই এ কথার কারণে সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। অথচ মহামারীর মধ্যে সংক্রমণের গুণ রয়েছে। যা আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত।
একজন মুসলিম বিশ্বাস রাখবে— মহামারী নিজ ক্ষমতায় ছড়ায় না; বরং আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছে ও হুকুমেই ছড়ায়। এজন্যই নবীজী  (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক জায়গায় মহামারীর সংক্রমণ (নিজস্ব ক্ষমতায় সংক্রমণ) কে অস্বীকার করলেও প্লেগ রোগ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন এবং মহামারী আক্রান্ত স্থানে যেতে এবং পূর্ব থেকেই সেখানে অবস্থান করলে বের হতে নিষেধ করেছেন। এসব হাদিস দ্বারাই তো প্রমাণিত হয়, রাসুলের ভাষ্য সংক্রমণ সঠিক। তবে সংক্রমণকেই রোগের কারণ মনে করা ভুল। কেননা রোগ দেয়া নেয়ার মালিক কেবল আল্লাহ তায়ালা।

৩. তাওয়াক্কুলের নামে বাড়াবাড়ি:
আগুনে ঝাঁপ দিলে আল্লাহ তায়ালা বাঁচিয়ে দিতে পারেন। কাউকে কাউকে দিয়েছেনও। এটা আল্লাহ তায়ালার কুদরত। কিন্তু স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হচ্ছে আপনি আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে। এটা আল্লাহর আদতের অংশ। পৃথিবী চলে আল্লাহর আদত তথা নির্ধারিত নিয়মে। সুতরাং আমাদেরকে সেভাবেই আল্লাহর উপর ভরসা বা তাওয়াক্কুল করতে হবে।

আনাস (রা:) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন: “জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল,হে আল্লাহর রাসূল! উটটিকে বাঁধার পর আল্লাহর উপর ভরসা করব? নাকি আল্লাহর উপর ভরসা করে (না বেঁধেই) ছেড়ে দিব? তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: “আগে তা বেঁধে দাও,তারপর আল্লাহর উপর ভরসা কর।” (তিরমিযী)
লাগামহীনভাবে চলাফেরা কখনো তাওয়াক্কুল নয়। তাওয়াক্কুলের নামে আমরা এখন বাড়াবাড়ি করছি। আমরা অনেকেই ভাবি, সবকিছু বাদ দিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করাই হচ্ছে তাওয়াক্কুল। অথচ তাওয়াক্কুল হলো, ভালো ও কল্যাণকর বিষয় অর্জনের জন্য সকল ব্যাপারে নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করা, সার্বিক প্রচেষ্টা চালানো এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করা। বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন ফলাফল তাই হবে। এটাই তাওয়াক্কুলের হাকিকত ও মূলকথা।

৪. করোনা নিয়ে মনগড়া ব্যাখ্যা:
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট বেশ সাড়া ফেলেছে। সেটি হচ্ছে—
ক— কুরআন।
রো— রোজা।
না— নামাজ।
করোনাকে অজ্ঞরা এভাবে ব্যখ্যা করছে। নিজের মনমত ব্যাখ্যা দাঁড় করে বলতে লাগল, কুরআন পড়লে, রোজা রাখলে এবং নামাজ পড়লেই করোনা থেকে মুক্তি মিলবে। আর কোনো কিছুর দরকার নেই। ভিত্তিহীন অযৌক্তিক কথাগুলো জনসাধারণ খুব ভালভাবেই নিচ্ছে। ধর্মের সঠিক জ্ঞান যদি থাকত তাহলে তারা এসব বানোয়াট কথাবার্তা বিশ্বাস করত না।
তবে হ্যাঁ, একজন মুসলিমকে অবশ্যই কুরআন পড়তে হবে, রোজা রাখতে হবে এবং নামাজ পড়তে হবে। এগুলোতে কোনোভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না। কিন্তু এগুলো করলেই যে করোনা থেকে মুক্তি মিলবে— এ কথা কে বলল?!

উমর (রা:) এর খিলাফতের সময়ে সিরিয়ায় প্লেগ রোগের মহিমারিতে অনেক প্রসিদ্ধ সাহাবায়ে কেরাম (রা:) শহীদ হয়েছেন। তাদের মধ্যে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত সাহাবী আবু উবাইদা বিন আব্দুল্লাহ বিন জাররাহ (রা:)-ও ছিলেন। তারা তো কুরআন পড়েছেন, রোজা রেখেছেন এবং নামাজ পড়েছেন‌। তাহলে এই আমলগুলো করা সত্ত্বেও কেন তারা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন? আমরা ইসলামকে কেন প্রশ্নবিদ্ধ করছি?

৫. করোনা নিরাময়কারী মহৌষধের গুজব:
করোনার বাংলাদেশে পৌঁছার আগে থেকেই বিভিন্ন গুজব ছড়ানো শুরু হয়েছে। কুরআন শরীফে পাওয়া চুল ধুয়ে পানি খেলেই করোনা থেকে মুক্তি মিলবে। এ নিয়ে সারাদেশে বেশ তোলপাড় চলেছে। এরপর আসল থানকুনি পাতার দাওয়া। তার রস খেলেই করোনা থেকে বাঁচা যাবে। ইত্যাদি। এগুলো না কুরআন ও হাদিস সম্মত আর না বিজ্ঞান সম্মত।

একেকটা গুজব ছড়ায় আর সবাই সেদিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ি। সত্যমিথ্যা যাচাইয়ের কোনো প্রয়োজন মনে করি না।  ফলে দিনশেষে তা আমাদেরকে অন্যদের সামনে হেয় ও তুচ্ছ প্রমাণিত করে। সহীহ হাদিসে এসেছে,

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন— আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেন নি, যার ঔষধ তিনি সৃষ্টি করেন নি। যে তা জানতে পারল সে তো জানলই, আর যে জানতে পারল না সে তা জানল না।
একজন মনীষী বলেছেন, ‘পৃথিবীর সব রোগেরই চিকিৎসা আছে। তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। অন্যথায় গুজবে কান দিয়ে নিজেকে শুধু শুধু কষ্ট দিবেন না।’

আমরা দেখছি, করোনার প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই বিভিন্ন অমুসলিম দেশগুলো তার প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য গবেষণায় নিয়োজিত হয়েছে এবং তারা সফলতার কাছাকাছি পৌছেও গিয়েছে। আর আমরা স্বপ্ন, গুজব, ভ্রান্তি ও অলীক কল্পনা-বিশ্বাসের দেয়ালে আটকা পড়ে আছি। আর কবে আমাদের ঘুম ভাঙবে!

৬. অপরিণামদর্শী চিন্তা-ভাবনা:
এমনও অনেক মানুষ আছে যারা কোনো কিছুকেই পাত্তা দিতে চায় না। সারা দুনিয়া এক দিকে আর তারা আরেক দিকে। ধ্বংসের পথে হেঁটেও তারা নির্বিঘ্ন, নির্ভীক। করোনা সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিলেও তাদের কাছে থোড়াই কেয়ার। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিজের জীবনকে ধ্বংসের সম্মুখীন করো না।’ (সূরা বাকারা: আয়াত; ১৯৫)

এসব ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?
এখনও সময় আছে সচেতন হোন। জনসমাগম এড়িয়ে চলুন। সরকার ও স্বাস্থ্যমন্ত্রালয়ের নির্দেশনা মেনে চলুন। যতটুকু সম্ভব নিজেকে বাসার মধ্যে বন্দী করে ফেলুন। নিজে বাঁচার জন্যে, এবং অন্যকে বাঁচানোর জন্য এটা এই মুহূর্তে একেবারে আবশ্যক কর্তব্য।
আপনার একটু গাফিলতির কারণে আপনার পরিবার, আপনার মা, সন্তান, স্ত্রী আক্রান্ত হবে, আপনার প্রতিবেশি আক্রান্ত হবে, তা আপনি হতে দিতে পারেন না।
আপনাকে যদি বাইরে যেতেই হয়, খুব সাবধানতা অবলম্বন করুন। কারণ করোনা ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে, টাকার মাধ্যমে ছড়াচ্ছে। তাই মাস্ক পড়ুন। সম্ভব হলে হ্যান্ড গ্লাভস ও চশমা পড়ুন। এগুলো ছাড়া ভুলেও বাইরে বের হবেন না।
বাইরে থেকে ফিরে এসে কারো সংস্পর্শে না গিয়ে, সোজা শাওয়ারে ঢুকে পড়ুন। ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফেলুন। পারলে গোসল করে ফেলুন সাথে সাথে। পরিধেয় কাপড়গুলোকে ডেটল কিংবা হুইল পাউডার দিয়ে ধুয়ে ফেলতে ভুলবেন না।
ঘরে অবসর সময়গুলোতে নামাজের প্রতি যত্নশীল হোন। বেশি বেশি কুরআন শরীফ পড়ুন। তওবা করুন। যিকর করুন। দোয়া করুন। দীনি বই পড়ুন। সদকা করুন। কুরআন শরীফে এসেছে— ‘আর, যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আমাকে শে’ফা দান করেন’। (সূরা আশ-শো’য়ারা – ৮০)
সবশেষে, আতঙ্কিত হবেন না। আল্লাহর ওপর ভরসা করে, যথাসম্ভব সতর্কতার সাথে থাকুন। এরপরও যদি আপনি আক্রান্ত হোন, তাহলে তা আপনার জন্য রহমত। কারণ, মহামারিতে কোনো মু’মিন মৃত্যু বরণ করলে সে শাহাদাতের মর্যাদা পাবে।

শিক্ষার্থী: হাটহাজারী মাদ্রাসা

Leave a comment

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: