শিরোনাম
স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৪ অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে ওমরাহ পালনের অনুমতি দেবে সৌদিআরব অবশেষে ৩ অক্টোবর পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন বেফাকের বিতর্কিত মহাসচিব আবদুল কুদ্দুস ৭১ টিভিতে আমাকে জড়িয়ে জঘন্য মিথ্যাচার করা হয়েছে; ক্ষমা না চাইলে মামলা করব : কারী রিজওয়ান আরমান জাতিসংঘের কি আদৌ প্রয়োজন আছে? সীমান্ত এলাকাকে আবারো অশান্ত করছে মিয়ানমার সমস্ত শয়তানি কার্যক্রমের উৎস হচ্ছে ইসরাইল-আমেরিকা: হুথি আনসারুল্লাহ হাটহাজারীতে আল্লামা আহমদ শফীকে কটূক্তি; শীর্ষ আলেমদের উদ্যোগে করা হচ্ছে মামলা ভারতের সঙ্গে কষ্টে গড়া সম্পর্ক ছোট্ট পেঁয়াজে নষ্ট হচ্ছে: সংসদীয় কমিটি ২১শে ফেব্রুয়ারি নয়, পশ্চিমবঙ্গে নতুন মাতৃভাষা দিবস চালুর চেষ্টায় বিজেপি আল্লামা আহমদ শফী রহ. -এর মাগফিরাত কামনায় রংপুরে দোয়া-মাহফিল অনুষ্ঠিত
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:২১ পূর্বাহ্ন
add

ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. ; যাঁর শূন্যস্থান কখনও পূরণ হবার নয়

কওমি ভিশন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৩ মে, ২০২০
add

আবু জোবায়ের


ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. শুধু একজন ব্যক্তিমাত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন কর্মবীর। লেখক। আলোচক। গবেষক। দায়ী। সংস্কারক। সংগঠক। চিন্তানায়ক। রাহবার। দিকপাল ইত্যাদি। তিনি কোনটি নন? এবং তিনি কী ছিলেন না? এটি এক বড় জিজ্ঞাসা। সুন্নাহকে ভালবেসে স্রোতের বিপরীতে নিরন্তর পথচলে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। নিজেকে একটি ইতিহাসে পরিণত করেছেন। এ সৌভাগ্য খুব কম জনেরই কপালে জোটে।

আল্লাহর দীনের দাওয়াতের জন্য একজন মানুষ কত বিনয়ী, কত নির্লোভ, কত তৎপর, কত নিবেদিত হতে পারেন; সর্বোপরি নানা মতের মুসলিমদেরকে যার যার ইতিবাচক দিকসহ কীভাবে আপন করতে পারেন এবং তাঁদের আপন হতে পারেন, তাঁর এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল।

তিনি এমন অসাধারণ ছিলেন যে, সে সময়ের লোকেরা কেউ তাঁকে অপছন্দ করেছেন, কেউ ভালোবেসেছেন, কেউ বা করুণা করেছেন, কিন্তু কেউ তাঁকে অস্বীকার করতে পারেননি। এই অস্বীকার করতে না পারার ব্যাপারটা ঠিকমতো প্রতিভাত হয় তাঁর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ঘরানার আলেমদের প্রতিক্রিয়ায়।

মানুষ যত বড় হয় তাঁর জীবনে তত বেশী অন্য জীবনের আলো থাকে এবং ছায়া থাকে। তাঁর জীবন হয়ে উঠে বহু জীবনের মিলনমোহনা। এমন জীবন হতে পারে আমাদের অনেকের জীবনের জন্য একটি আলোকপ্রদীপ। তাঁর কীর্তমান জীবনের নানা দিক রয়েছে। এখানে কয়েকটি দিক তুলে ধরার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

উত্তম আখলাক


ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত সদালাপী ও বিনয়ী ছিলেন। আন্তরিকভাবে নিজেকে ছোট হিসেবে পেশ করতেন, নিজের আলাদা একটা ভাব বা শান রাখতেন না, সাদামাটা জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। ছোটদেরকে তার যোগ্যতার যথাযথ প্রশংসা করে এগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন। যারাই তাঁর সাথে কিছু সময় কাঁটিয়েছে তারা তাঁর ব্যবহারে মুগ্ধ না হয়ে পারেনি। তিনি ব্যক্তি নয় বরং কর্মের সমালোচনা করতেন। কখনো তিনি তাঁর আপনজন বা চরম বিরোধীদেরও সমালোচনা করতেন না। উত্তম চরিত্রের অধিকারী এই মানুষটি সর্বদা কথাবার্তা ও চালচলনে পরিপূর্ণ সুন্নাহ অনুসরণের চেষ্টা করতেন।

সময়ের মূল্যায়ন


তিনি সময়ানুবর্তিতার সাথে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। কোনোভাবেই সময়ের অপচয় করতেন না। তাঁর ব্যক্তিগত বহু জাতিক বই সমৃদ্ধ লাইব্রেরী ছিলো, যেখানে তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, উসূল ও আরবী সাহিত্য বিষয়ক মৌলিক গ্রন্থাদির পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে বাংলা-ইংরেজি বইও ছিলো। তিনি প্রচুর পড়াশোনা করতেন, যা তাঁর তথ্যবহুল লেখনী ও আলোচনা দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।

হক্ব গ্রহণে উদারতা


তাঁর মধ্যে কোনো ধরনের ইলমী গোঁড়ামী ছিল না। তিনি সবসময় হক বিষয়টি কবুল করে নিতেন, নিজের মত আঁকড়ে থাকতেন না। যখনই কোনো বিষয় তাঁর সামনে দলিলভিত্তিক উপস্থাপন করা হয়েছে এবং বিষয়টি তিনি বুঝতে পেরেছেন, তৎক্ষণাৎ তাঁর পূর্বের মত থেকে ফিরে এসেছেন।

এছাড়াও মাহফিলের আলোচনাতে বারবার বলতেন, আমার লিখিত বা বর্ণিত কোনো মাসআলা যদি প্রকৃত অর্থে ভুল হয় এবং কেউ সেটা দলিলভিত্তিক আমাকে ধরিয়ে দেয়, তাহলে আমি সেটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত আছি এবং যে আমার ভুল শুধরে দিবে আমি তাঁর জন্য দুআ করবো।

তাঁর চিন্তাধারা


তিনি আরবের হাম্বলী ও সালাফী আলেমদের সহচর্যে থাকলেও হানাফী আলেমদের মধ্যে শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ.-কে অত্যন্ত পছন্দ করতেন এবং তাঁর রচনাসমূহ প্রচুর পরিমাণে অধ্যয়ন করতেন। উপমহাদেশের আলেমগণের মধ্যে শায়খুল ইসলাম আল্লামা তাকী উসমানী দা.বা. ও তাঁর মানহাজকে খুব পছন্দ করতেন এবং বিভিন্ন ইলমী বিষয়ে তাঁর বক্তব্যকে উদ্ধৃতি হিসেবে পেশ করতেন। তিনি ইবনে তাইমিয়া রহ., ইবনুল কায়্যিম রহ., শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. ও আব্দুল হাই লখনবী রহ.-এর রচনাসমূহ ও চিন্তা-চেতনা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন এবং বিভিন্ন ইলমী মোহাযারায় তাদের আলোচনা করতেন। তবে ফিক্হ বিষয়ে আদর্শ হিসেবে শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ.-এর অনুসরণ করতেন।

তাঁর লেখালেখি


তিনি অনেক বিচিত্র বিষয়ে কলম ধরেছেন এবং তিনি যে বিষয়েই কলম ধরেছেন, সেই বিষয়েই তিনি যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর বিষয়চয়ন ছিল সম্পূর্ণ মৌলিক এবং যুগের চাহিদা মুতাবিক। এহইয়াউস সুনান, হাদিসের নামে জালিয়াতি, ইসলামী আকীদা, রাহে বেলায়াত, ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ, পবিত্র বাইবেল পরিচিতি ও পর্যালোচনা–এই ধারারই বই। প্রত্যেকটি বই-ই ঐ বিষয়ের প্রামাণ্য বই বলেই বিবেচিত।

কর্মপদ্ধতি


তাঁর মূল পড়াশোনা আরবে হলেও আরবের প্রচলিত মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হননি। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রজ্ঞায় প্রবুদ্ধ। জগৎ ও জীবনকে সুন্নাহর চোখে দেখবার, জানবার ও বুঝবার প্রয়াসী ছিলেন। এজন্যই তিনি আরব থেকে পড়ে এসেও এই দেশে আরবের প্রচলিত মতবাদ প্রচার করেননি। বরং বাংলাদেশের সমাজ, পরিবেশ, রাষ্ট্র বুঝে তাঁর দাওয়াত ছড়িয়েছেন। তিনি দেখিয়ে গেছেন, প্রচলিত সিস্টেমের মধ্যেই কীভাবে মানুষকে সুন্নাহর দিকে ডাকা যায়। তিনি ডেসট্রাকটিভ ছিলেন না, আরব থেকে এসে এই দেশের সমস্ত মেহনত হালের সালাফিদের মতো অস্বীকার করেননি। দেশকাল বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর মত দূরদর্শী আলেম খুব কমই আছে।

ঐক্যের প্রচেষ্টা


বিভিন্ন মতবাদে বাংলাদেশের মুসলিম উম্মাহ যখন নানাভাবে বিভক্ত তখন এই মানুষটি ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। খুঁটিনাটি বিষয়কে প্রাধান্য না দিয়ে উম্মাহর কঠিন সমস্যাগুলো নিয়ে মানুষটি বেশি বেশি বলেছেন, কাজ করেছেন। মতবাদের বিষয় নিয়ে মানুষকে দূরে ঠেলে না দিয়ে কিভাবে কাছে টেনে বোঝাতে হয় সেই উদাহরণ রেখে গিয়েছেন আমাদের সামনে। দেশের যেকোনো অঞ্চলে কাজ করার জন্য মানুষটি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। বিভিন্ন জেলায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে অহরহ ছুটে বেড়িয়েছেন মানুষকে দীন ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছে দিতে।

সালাফীদের সমীপে


তিনি বলতেন, আমাদেরকে চলতে হবে সুন্নাহ ও উম্মাহকে সঙ্গে নিয়ে। অর্থাৎ শরীয়তের দলীল তো হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ এবং এই সুন্নাহই উম্মতের জন্য উসওয়ায়ে হাসানা ও সর্বোত্তম আদর্শ। তবে যেহেতু অনেক মাসআলার ক্ষেত্রেই সুন্নাহর বিভিন্নতা রয়েছে, আবার বহু মাসআলার মধ্যে সুন্নাহ অনুধাবনের ক্ষেত্রে বা তার আমলী রূপরেখা নির্ধারণের ক্ষেত্রে হাদীস ও সুন্নাহ-বিশেষজ্ঞ ফকীহদের মাঝে ইজতিহাদী ইখতিলাফ রয়েছে, এজন্য নিয়ম এটা হওয়া উচিত, যে এলাকায় উম্মাহর মধ্যে যে আমল চালু আছে যদি সুন্নাহয় তার কোনো নির্ভরযোগ্য দলীল বিদ্যমান থাকে তাহলে সাধারণ মানুষের সামনে ঐ সুন্নাহর বিপরীতে আরেক সুন্নাহর দাওয়াত দিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করা উচিত নয়। আমরা আশা করব, আমাদের দেশের সালাফী আলিমগণ অন্তত ফুরুয়ী ইখতিলাফের ক্ষেত্রে তার কর্মপন্থাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবেন।

সালাফীদের ভেতর-বাহির


তিনি ঔবলতেন, হাদীসের নাম দিয়ে সমাজে প্রচলিত জায়েয-মুবাহকে হারাম বলবেন, দলিলভিত্তিক মতকে মন্দ বলবেন, মাযহাব মানাকে হারাম বলবেন, আর নিজে মাযহাব তৈরি করবেন, গালিগালাজ করবেন, সেটা আমি অপছন্দ করি। আমার কাছে এটা মুনকার। আল্লাহ তাআলা এরূপ করতে নিষেধ করেছেন। যারা মাযহাবের বিরুদ্ধে কড়া কথা বলে, আমি তাদের সাথে প্রোগ্রাম করি না। কখনো সরাসরি নিষেধ করি। আবার কখনো কৌশলে এড়িয়ে চলি। যখন কেউ আমাকে বলে মাযহাবের মাধ্যমে দলাদলি সৃষ্টি হয়েছে, আমি বলি, না; বরং আহলে হাদীসের মাধ্যমে দলাদলি সৃষ্টি হয়েছে। সমাজে যেটা প্রচলিত আছে এবং তার পক্ষে আমি দলিল পাচ্ছি, এটা নিয়ে ঝগড়া করার দরকার কী? সৌদি আলেমদেরকে এটা নিয়ে ঝগড়া করতে দেখিনি। ফিকহী ব্যাপারে আমি মনে করি, এই তার্ফারুক (বিভেদ) ঠিক না, এটা উম্মতের ক্ষতি করে।

সমালোচক আলেমদের প্রতি তাঁর আহ্বান


ওয়াজ মাহফিলে বা সাধারণ মানুষদের মজলিসে যদি কেউ ‘উলামায়ে কেরামের’ সমালোচনা করতো তাহলে তিনি খুবই কষ্ট পেতেন। তিনি বলতেন, ‘উলামায়ে কেরামের’ দোষ-ত্রুটি কল্যাণকামিতারর সাথে কেবল তাঁদের মজলিসেই বলা যেতে পারে। তাহলে তাঁদের সংশোধনের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু সাধারণ মানুষদের সামনে তাঁদের সমালোচনা করলে কিছু মানুষ খুশি হয়। কারণ এই লোকগুলো উলামায়ে কেরামের সমালোচনার অপেক্ষায় থাকে, তাঁদের সমালোচনা শুনতে পছন্দ করে। তাছাড়া সাধারণ মজলিসে এরূপ সমালোচনার কারণে আলেম ও জনগণের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ দীন থেকে দূরে সরে যায়। সুতরাং যে কাজ সাধারণ মানুষকে দীন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, একজন আলেমের এমন কাজ করা উচিত নয়।

কওমী আলেমদের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক


জীবনের শেষ দশকে কওমী আলেমদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিশেষত ‘মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা’-তে তিনি আসা-যাওয়া করতেন এবং একপর্যায়ে তিনি সেখানকার ইলমী গবেষণা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিতও হোন। ‘মারকাযুদ দাওয়াহ্’র প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমার ছাত্ররা বড় অফিসার হওয়ার চেয়ে অল্প আলোতে বসে কুরআন-হাদীস নিয়ে গবেষণা করবে, কিতাবপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করবে- আমি মনে করি দুনিয়া ও আখিরাতে এটাই আমার বড় পাওয়া।” এ লক্ষ্যেই তিনি পর্যায়ক্রমে ‘তাখাসসুস’ ও ‘কিতাব বিভাগ’ চালু করেন। তিনি হাটহাজারী মাদরাসায় এক সফরে গেলে সেখানকার নূরানী শিক্ষাব্যবস্থা দ্বারা অত্যন্ত মুগ্ধ হন এবং সে বছরই  নূরানী পদ্ধতিতে প্রাইমারী শিক্ষা চালু করেন।

সকল ধারার মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি


তিনি কওমী, আলিয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিতদের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করতেন। এ লক্ষ্যেই তিনি ‘আততাখাসসুস ফী উলূমিল হাদীস’ ও ‘আততাখাসসুস ফিদ দাওয়াহ’ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে সুন্দর ব্যবস্থাপনায় কওমী, আলিয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী এবং যোগ্যতাসম্পন্ন ছাত্ররা পড়াশুনা করছে।

বিদআতীদের বিপক্ষে তাঁর অবস্থান


তিনি বলতেন, আমার কাছে সবচেয়ে জরুরি মনে হয় র্শিক-কুফর বিদআত, আল্লাহর হক্ব, বান্দার হক্ব, ফরয, ওয়াজিব, হালাল-হারাম ইত্যাদি। এরপর ইখতেলাফ থাকবে। আমি এ ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করি। এজন্য যারা র্শিক-কুফর, বিদআত ও মাজার পূজায় লিপ্ত যেমন, শিয়া-কাদিয়ানী, আটরশি, চন্দ্রপাড়া, মাইজভাণ্ডারী এবং ঐসব রেজভী-বেরলভী- যারা আকীদা ও আমলের বিভিন্ন শিরকে লিপ্ত; এদের কারও সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমার লেখালেখি ও আলোচনার মূল বিষয়ই হলো তাদের গোমরাহী থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করে তাওহীদ ও সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে আনা। তবে যারা মৌলিকভাবে কুরআন-সুন্নাহ মেনে চলে এরূপ সকল রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক দলকে আমি পছন্দ করি; কিন্তু আমি কোনো দলের সাথে সম্পৃক্ত নই।

তাঁর আলোচনার সৌন্দর্য


তিনি সাধারণত র্শিক, বিদআত, সুন্নাতের গুরুত্ব ও সুন্নাহ অনুসরণ, বান্দার হক্ব, আত্মীয়তার হক্ব, সমকালীন প্রসঙ্গ, সামাজিক ও পারিবারিক বিষয়সহ অন্যান্য সমাজ ও জীবনঘনিষ্ঠ প্রয়োজনীয় বিষয় সহজ ও সাবলীলভাবে আলোচনা করতেন। পারতপক্ষে আলোচনায় আকীদা ও ফিকহী জটিল বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতেন। আধুনিক শিক্ষিত সালাফী ব্যক্তিবর্গকে প্রান্তিকতা পরিহার করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মধ্যপন্থা অবলম্বনের জন্যও তিনি উদ্বুদ্ধ করতেন। এছাড়াও বিভিন্ন প্রসঙ্গে যুবকদেরকে সম্বোধন করে আলোচনা করতেন। তাদের আবেগ-অনুভূতি ও বিভ্রান্তির বিষয়গুলো তুলে ধরে দরদমাখা ভাষায় সংশোধনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। এ কারণে যুবকদের বড় একটি শ্রেণি তাঁর ভক্ত ছিলো।

দীন প্রচারে তাঁর বহুমুখী পদক্ষেপ


তিনি সর্বদা মানুষকে দীনমুখী করার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। মানুষের দীনী উন্নতির ফিকির করতেন। এজন্য তিনি এলাকার মুসলামানদের দীনী শিক্ষাকে সহজ করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন দীন-শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন। যেমন-
১. উচ্চতর হাদীস গবেষণা বিভাগ এবং উচ্চতর দাওয়াহ ও তুলনামূলক ধর্মবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা।
২. কিতাব বিভাগ ও নূরানী মক্তব প্রতিষ্ঠা।
৩. বালিকা হিফজ বিভাগ ও কিতাব বিভাগ প্রতিষ্ঠা।
৪. লেখনী ও ধর্মীয় বই-পুস্তক রচনা।
৫. প্রতি ইংরেজি মাসের প্রথম শুক্রবার আস-সুন্নাহ জামে মসজিদে মাসিক মাহফিলের আয়োজন।
৬. ঝিনাইদহ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের নিয়ে নিজ প্রতিষ্ঠানস্থ মসজিদে প্রায় প্রতি মাসেই ‘ইলমী ইজতিমা’-এর আয়োজন।
৭. খ্রিস্টান মিশনারীদের অপতৎপরতার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ।
৭. টিভি প্রোগ্রামের মাধ্যমে দীনের প্রচার-প্রসার।

সামাজিক কর্মকাণ্ডসমূহ


ক. সেলাই প্রশিক্ষণ: 
সাধারণ শিক্ষিত ও দুঃস্থ মহিলাদের মাঝে দীনী শিক্ষা ও দীনী চেতনার প্রসারে ছয় মাস ব্যাপী কুরআন তিলাওয়াত সহীহ করা ও দীনের মৌলিক বিষয়গুলো শেখানোর পাশাপাশি স্থানীয় সমাজ-সেবা অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ প্রশিক্ষিকার মাধ্যমে সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ।

খ. বিনামূল্যে চিকিৎসা-সহায়তা প্রকল্প:
আর্ত মানবতার সেবা ও মানুষদেরকে দীনী পরিবেশের সাথে পরিচিত করার মাধ্যমে দীনমুখী করার লক্ষ্যে প্রতি শুক্রবার মাদরাসায় স্থানীয় সরকারী হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অভিজ্ঞ হোমিও চিকিৎসক দ্বারা রোগী দেখার ব্যবস্থা গ্রহণ। সেখানে রোগীদেরকে বিনামূল্যে ব্যবস্থাপত্র ও জরুরি ঔষধ প্রদান করা হয়।

গ. নওমুসলিমদের তত্ত্বাবধান:
তিনি নওমুসলিমদের প্রতি সবিশেষ খেয়াল রাখতেন এবং বেশ কয়েকজন নওমুসলিমকে তাঁর তত্ত্বাবধানে রেখে পড়াশোনা ও অন্যান্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

তিনি এমনই বৈচিত্র্যময় ও কর্মবহুল এক আলোকিত জীবনের অধিকারী ছিলেন। তাঁর জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে হীরা-জহরত ও মণি-মুক্তা। তাঁর সাহাবা চরিতের জীবনে আমাদের জন্য আদর্শ ও অনুসরণের অনেক কিছুই রয়েছে। তাঁর দেখানো পথে চলে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির এক দৃঢ় বন্ধন গড়ে উঠুক এবং আল্লাহ তা’আলা তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সুউচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর লালিত সব স্বপ্ন ও অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পূর্ণ হোক— এটাই আমাদের কামনা ও প্রার্থনা।


তরুণ লেখক  ও শিক্ষার্থী, হাটাহাজারী মাদ্রাসা।

Leave a comment

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: