শিরোনাম
আরব-ইসরাইল সম্পর্কের প্রতিবাদে বাহরাইনে বিক্ষোভ চলছেই হাটহাজারীর ছাত্র বিক্ষোভের সমর্থনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশের ডাক দিলেন ভিপি নুর হাটহাজারিতে আবারো বিক্ষোভে ছাত্ররা, সব দাবী আদায় না হওয়া পর্যন্ত মাঠ না ছাড়ার সিদ্ধান্ত দাবি আদায়ের লক্ষ্যে হাটহাজারী মাদ্রাসার মাঠে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভকারীদের আনাস মাদানির বহিষ্কারসহ ৫ দফা দাবিতে উত্তাল হাটহাজারী মাদ্রাসা ইহুদিবাদী ইসরাইলের সাথে আরব দেশের সম্পর্ক ফিলিস্তিনি জনগণ মেনে নেবে না সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের বয়সে ৫ মাস ছাড় মুসলিম নির্যাতনের অভিযোগে চীন থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ করলো যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির অঙ্গীকার পূণর্ব্যক্ত করলো তুরস্ক সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমেই কেবল ফিলিস্তিন মুক্ত হবে: হিজবুল্লাহ
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:৩৭ অপরাহ্ন
add

পালনপুরি সাহেবের কলমে “মতাদর্শের উদারতা”

কওমি ভিশন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৯
add


• মূল : মুফতি সাইদ আহমাদ পালনপুরি দা.বা.


• অনুবাদ : আবদুল্লাহ আল ফারুক


মাসলাক বা মতাদর্শের কথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর একটি বিখ্যাত হাদিসে উল্লেখ করেছেন। যেখানে তিনি বলেছেন,
تَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةً ، قَالُوا : وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ : مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي
‘আমার উম্মত তেহাত্তর ফেরকায় বিভক্ত হবে। একটি দল ব্যতিরেকে সবগুলো ফেরকা জাহান্নামে যাবে। সাহাবায়ে কেরাম রা. তখন জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই দল কোনটি?
উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যেই মতাদর্শের ওপর আমি ও আমার সাহাবায়ে কেরাম অবস্থান করছি, সেই মতাদর্শের অনুসারীরাই নাজাতপ্রাপ্ত।’ [সূনান তিরমিযি, হাদিস নং : ২৬৪১]
সেই ৭২টি মাসলাক বা মতাদর্শের অনুসারীরা জাহান্নামে যাবে; শুধু আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ আকিদার বিশুদ্ধতার কারণে জান্নাতে যাবে।
কাজেই আমাদের দায়িত্ব দুটি,
  • ১. মানুষকে দীনের দিকে দাওয়াত দেওয়া।
  • ২. গুমরাহ জামাতগুলোর পক্ষ থেকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের ভারসাম্যপূর্ণ মাসলাক (দেওবন্দিয়্যাত) এর ওপর আক্রমণ হলে তা প্রতিরোধ করাও আমাদের দায়িত্ব। এই মতাদর্শকে যেকোনো ধোঁয়াশা, সন্দেহ ও গোঁজামিল থেকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। কেননা যদি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত চুপ থাকে এবং গুমরাহ ফেরকাহগুলোর গুমরাহি স্পষ্ট না করে তাহলে আখেরে হকপন্থীদেরই ক্ষতি হবে। গুমরাহ ফেরকাগুলো নিজেদের গুমরাহি ছড়াতে থাকবে এবং হকপন্থীদের জমিন সংকুচিত হতে থাকবে।

একটি শিক্ষণীয় ঘটনা

একবার ব্যাঙ্গলোরে দারুল উলূম দেওবন্দের স্নাতক কাসেমিদের সঙ্গে স্থানীয় সাবিলুর রশাদের স্নাতকদের টানাপোড়েন দেখা দেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক বছর পূর্বে দারুল উলূম দেওবন্দের স্নাতকরা সেখানে ‘শরিয়ত হিফাজত কনফারেন্স’ আয়োজন করে। সেখানে সাবিলুর রশাদ ব্যাঙ্গলোরের মুহতামিম মাওলানা আশরাফ আলি বাকুভি রহ. ও দারুল উলূম দেওবন্দ ওয়াকফের মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মদ সালিম কাসেমি রহ. বয়ান করেন যে,
دين منزل من الله هے، مسلك منزل من الله نهىں هے، اور جس چيز مىں انسانى اجتهاد كا دخل هو، وه قابل ترجيح تو هو سكتى هے، قابل تبليغ نهىں هے
“দীন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ; কিন্তু মাসলাক আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নয়। আর যে জিনিসের মাঝে মানুষের ইজতিহাদের ভূমিকা রয়েছে, সেই জিনিস ব্যক্তির নিজস্ব বিবেচনায় প্রণিধানযোগ্য হতে পারে বটে; কিন্তু সেটা অন্যদের মাঝে প্রচারের যোগ্য নয়।”
তাঁদের এই আলোচনা ছিল সেমিনারের আলোচ্য বিষয়ের পরিপন্থী। আমি সেই দু’ হযরতের উপস্থিতিতে তাঁদের আলোচনা খণ্ডন করি। আমি বলেছি, “এ কথা আল্লাহর নির্দেশনার পরিপন্থী। সূরা আনআমের ১৫৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
﴿وَاَنَّ هٰذَا صِرَاطِیْ مُسْتَقِیْمًا فَاتَّبِعُوْهُ ۚ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِیْلِه ذٰلِكُمْ وَصّٰكُمْ بِه لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ○﴾
“নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চলো এবং অন্যান্য পথে চলো না। তা হলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা সংযত হও।” [সূরা আনআম : ১৫৩]
এ আয়াতের তাফসির হলো, আল্লাহর রাস্তা বলে উদ্দেশ্য হলো, ইসলামের রাস্তা ও আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর রাস্তা। আর অন্যান্য রাস্তা বলে উদ্দেশ্য হলো, অন্যান্য ধর্ম ও মুসলমানদের বিভিন্ন ফিরকার রাস্তা। কাজেই নির্দিষ্টভাবে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মতাদর্শের ওপর চলা মুসলমানদের ওপর আবশ্যক। অন্যান্য ধর্ম ও গুমরাহ ফিরকার পথ-মত থেকে বেঁচে থাকাও মুসলমানদের ওপর জরুরি। ৭৩ ফেরকার বিবরণ সমৃদ্ধ হাদিসের মাঝেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুরূপ নির্দেশ করেছেন। আর ইজতিহাদের ভূমিকা হলো ফুরু’ তথা শাখাগত বিষয়াবলির ক্ষেত্রে। উসূল তথা মূলনীতির ক্ষেত্রে নয়। কাজেই চার ফিকহি মাযহাবের প্রতিটিকেই হক মানা জরুরি।
এরপর আমি বলেছি, ‘যদি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মতাদর্শের প্রতি দাওয়াত না দেওয়া হয় এবং গুমরাহ ফিরকাগুলোর গুমরাহি জনগণকে না জানানো হয় আর সমস্ত ফেরকাকেই সহিহ মেনে নেওয়া হয় তাহলে এ অবস্থানের কারণে একদিকে গুমরাহি ছড়াতে থাকবে, অন্যদিকে হকপন্থীদের ময়দান সংকুচিত হতে থাকবে।

দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে

একটি মজার ঘটনা

আমি সেই সেমিনারে আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর খসরু সাহেবের একটি মজার ঘটনা শুনিয়েছি। একবার ভার্সিটির ছাত্রদের মাঝে কোনো বিষয় নিয়ে ঝগড়া বেঁধে যায়। হাতাহাতির মতো কাণ্ডও ঘটে। তখন তাদের একটি পক্ষ ভাইস চ্যান্সেলর সাহেবের কাছে আসে এবং অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পেশ করে। খসরু সাহেব তাদের অভিযোগ মনোযোগের সঙ্গে শুনে বলেন, ‘আপনারা সঠিক বলেছেন।’ তারা নিশ্চিন্ত হয়ে চলে যায়।
এরপর দ্বিতীয় পক্ষ আসে। তারাও প্রতিপক্ষ সম্পর্কে অভিযোগের ফিরিস্তি দাখেল করে। ভাইস চ্যান্সেলার সাহেব তাদের বক্তব্যও পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে শোনেন এবং তাদেরকেও বলেন, ‘আপনারা সঠিক বলেছেন।’ তখন তারাও নিশ্চিন্ত মনে ফিরে যায়।
পর্দার আড়াল থেকে বেগম সাহেব পূর্ণ ঘটনা দেখলেন। তিনি স্বামীর কাছে এসে বললেন, ‘তাজ্জব মানুষ তো আপনি। দু’পক্ষকেই বলেছেন, ‘আপনারা সঠিক বলেছেন।’ প্রফেসর সাহেব স্ত্রীর মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে বললেন, ‘আপনিও সঠিক বলেছেন।’
যদি আমরা বাতিল ও গুমরাহ ফেরকাগুলোর বিরুদ্ধে না বলি, তাহলে প্রফেসর সাহেবের সেই কাণ্ড আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআর সরল পথের ক্ষেত্রেও ঘটবে। যা উল্লিখিত আয়াত ও হাদিসের সুস্পষ্ট পরিপন্থী।’
মোটকথা, আমরা অবশ্যই দীনের দাওয়াত দেব; কিন্তু এর পাশাপাশি আহলে হকের এই মাসলাকের হিফাজতের প্রতিও খেয়াল রাখবো। ইতিহাসের পাতা মেলে দেখুন, যখনই আহলে হকের এই মাসলাকের ওপর আক্রমণ হয়েছে, সাথে সাথে দারুল উলূমের আকাবিরগণ তা প্রতিহত করেছেন। দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাকালে গায়রে মুকাল্লিদরা একটি পোস্টার ছড়িয়ে দেয়। সেখানে তারা অবিভক্ত হিন্দুস্তানের সকল হানাফিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় যে, ‘তোমাদের এই ১০টি মাসায়িল হাদিস দিয়ে প্রমাণিত করো।’ এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে অনেক বড় পুরস্কারও ঘোষণা করে। তারা সেই পোস্টার যদিও হিন্দুস্তানের মাঝে ছড়িয়ে দেয়নি; কিন্তু দারুল উলূম দেওবন্দের ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। যার পরিষ্কার অর্থ ছিল, তারা দারুল উলূমের আকাবিরগণকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তাদের সেই চ্যালেঞ্জের উত্তরে আমাদের আকাবির রহ. ‘আদিল্লায়ে কামিলা’ লেখেন। বইটি যদিও হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. এর নামে প্রকাশিত হয়েছে; কিন্তু কথিত আছে, হযরত নানুতুভি রহ. এর দেওয়া তথ্য ও ভাষা নিয়েই বইটি সংকলিত।
গায়রে মুকাল্লিদরা সেই কিতাবের জবাব লেখে। নাম দেয় ‘মিসবাহুল আদিল্লা’। বইটির নামই কিম্ভুৎকিমার। কেননা মিসবাহুল আদিল্লার অর্থ, দলিলসমূহের আলো। যার ব্যাখ্যা দাঁড়ায়, লেখক এ বইয়ের মাঝে আদিল্লায়ে কামেলা গ্রন্থে উপস্থাপিত দলিলসমূহকে স্পষ্ট করেছেন। অথচ আদতে বইটি আদিল্লায়ে কামেলার জবাবে লেখা। বইটির লেখক পরবর্তীকালে কাদিয়ানি হয়ে গিয়েছিল। হযরত নানুতুভি রহ. এর ইনতিকালের পর হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. সেই বইটির জবাব লিখেছেন। নাম, ইযাহুল আদিল্লা। অর্থ, ‘আদিল্লায়ে কামেলার দলিলসমূহের ব্যাখ্যা’। এ ঘটনা থেকে আমরা যে শিক্ষাটি পাই তাহলো, যখনই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মাসলাকের ওপর গায়রে মুকাল্লিদদের পক্ষ থেকে আক্রমণ হবে, তখন তা প্রতিহত করা জরুরি। এটাকেই বলে মাসলাকের হিফাজত।
এর কিছু দিন পর জামাতে ইসলামি প্রতিষ্ঠিত হয়। সর্বপ্রথম হযরত শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. ‘আযমতে সাহাবা’ বা ‘সাহাবায়ে কেরাম রাদি.এর অত্যুচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব’ এর মাসআলা সামনে রেখে দ্বিমত ব্যক্ত করেন। দেওবন্দ সবসময় আযমাতে সাহাবার ইস্যুতে অত্যন্ত সজাগ। যখন জামাতে ইসলামির সংবিধানে লেখা হয়, الله ورسول كے سوا كسى كى ذهنى غلامى نه كى جائے ‘আল্লাহ ও রাসূল ব্যতিরেকে অন্য কারো মানসিক দাসত্ব করা যাবে না’। তখন প্রশ্ন ওঠে, তবে কি সাহাবায়ে কেরাম রাজি. এর কথা ও কর্মকাণ্ড প্রমাণ নয়? মনে রাখতে হবে, এটি সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করা-না করা (تنقيد-عدم تنقيد) নিয়ে প্রশ্ন নয়; বরং তাঁদেরকে সত্যের মাপকাঠি বিশ্বাস করার প্রশ্ন। জামাতে ইসলামি সাহাবায়ে কেরামকে সত্যের মাপকাঠি বিশ্বাস করেনি; এজন্যে তাদেরকে গুমরাহ ঘোষণা করা হয়। এরপর হযরত মাদানি রহ. এর পদচিহ্ন অনুসরণ করে হযরত মাওলানা মনযুর নু‘মানি রহ. ও হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলি নদভি রহ.ও জামাতে ইসলামির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন।

শাইখুল ইসলাম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানি রহ.
সেসময় দারুল উলূম দেওবন্দের কয়েকজন জুনিয়র উসতায মওদুদি সাহেবের লেখালেখিতে প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। মাযাহিরে উলূম সাহারানপুরের কয়েকজন শিক্ষকও প্রভাবিত হয়েছিলেন। এমনকি মাওলানা মাওলানা যাকারিয়া কুদ্দুসি তো রীতিমত জামাতের সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন। সেসময় দারুল উলূম দেওবন্দের যেসকল উসতায মওদুদি সাহেবের লেখালেখিতে প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন, তাদেরকে দিয়ে হযরত মাদানি রহ. মওদুদি সাহেবের বক্তব্যের খণ্ডনমূলক বই লেখান। ‘মিরাজ কি রাত’ নামে মওদুদি সাহেবের একটি বই আছে। মাওলানা সালেম সাহেব রহ.-কে দিয়ে তার খণ্ডনমূলক বই লেখান। নাম, ‘হাকিকতে মিরাজ’। দারুল উলূম দেওবন্দের প্রকাশনা ও প্রচারণা বিভাগ বইটি প্রকাশ করেছে।
মাযাহিরে উলূম সাহারানপুর থেকে শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা যাকারিয়া রহ. মওদুদি সাহেবের খণ্ডনে ‘ফিতনায়ে মওদুদিয়্যাত’ নামে একটি বই লিখেছেন। বইটি এখন ‘জামাতে ইসলামি : এক লামহায়ে ফিকরিয়্যাহ’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। যেসকল জুনিয়র শিক্ষক জামাতের বইপত্রের কারণে প্রভাবিত হয়েছিলেন, তাদের কাছে সেই বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রেরণ করেন এবং মাওলানা কুদ্দুসিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। এভাবে সেখানকার ফিতনা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল দেওবন্দের মাসলাকের হিফাজতের স্বার্থে, যা সেসময়কার হকপন্থীদের অনিবার্য দায়িত্ব ছিল।

একটি শিক্ষণীয় ঘটনা

যখন দারুল উলূম দেওবন্দে সদসালা জলসা (শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান) হয় সেসময় মুহতামিম ছিলেন হযরত হাকিমুল ইসলাম কারি তাইয়্যেব রহ.। তিনি দরজায়ে উলয়া (উচ্চ মাধ্যমিক স্তর) এর শিক্ষকবৃন্দ ও উসতা আলিফ (মাধ্যমিক ‘ক’ স্তর) এর শিক্ষকবৃন্দকে ডেকে পাঠান। আমি তখন উসতা আলিফ স্তরের শিক্ষক। সেই পরামর্শসভার বিষয়বস্তু ছিল, শতবার্ষিকী জলসায় কাদের দাওয়াত দেওয়া যায়। সমস্ত শিক্ষক এ বিষয়ে একমত হন যে, শুধু হকপন্থীদেরকেই দাওয়াত দেওয়া হবে। কোনো গুমরাহ ফেরকাকে দাওয়াত দেওয়া হবে না। সেই ধারাবাহিকতায় সবার আগে গায়রে মুকাল্লিদদের নাম আসে। সমস্ত শিক্ষকমণ্ডলী একমত হন যে, তারা হকপন্থীদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের দাওয়াত দেওয়া হবে না। এরপর জামাতে ইসলামির নাম ওঠে। সম্মানিত সাহেবযাদা হযরত মাওলানা সালিম সাহেব হযরত হাকিমুল ইসলাম রহ. এর কাছে প্রস্তাব করেন যে, তারা আহলে হকের মাঝে অন্তর্ভুক্ত। তাদের নিমন্ত্রণ করা হোক। তার কথা শুনে সকল শীর্ষস্থানীয় শিক্ষক নিশ্চুপ। কেউ কোনো কথা বলছেন না। তখন আমি হযরত হাকিমুল ইসলাম রহ.কে বললাম, মওদুদি জামাত আহলে হকের মাঝে অন্তর্ভুক্ত নয়। আমাদের আকাবিরগণ তাকে গুমরাহ অভিহিত করেছেন। কাজেই তাদেরকে দাওয়াত না দেওয়া হোক।
যখন আমি এ কথা বললাম তখন হযরত মাওলানা সালিম সাহেব আমার দিকে ফিরলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তারা গুমরাহ কেন? আমি একটা কারণ বললাম, তিনি তার জবাব দিলেন। আমি দ্বিতীয় কারণ বললাম। তিনি তারও জবাব দিলেন। আমি তৃতীয় কারণ বললাম। এবার তিনি চুপ হয়ে গেলেন। তার সঙ্গে আধাঘণ্টা আমার এই আলোচনা চলে। সবশেষে হযরত হাকিমুল ইসলাম বললেন, ‘আমি আপনাদের দু’জনের কথাবার্তা মনোযোগের সঙ্গে শুনেছি। আমার অভিমত হলো, তাদের দাওয়াত না দেওয়া হোক।’ হযরত রহ. এর কথাটি ছিল পরামর্শের চূড়ান্ত কথা। সেমতে মাদরাসা পরিচালকের পক্ষ থেকে শতবার্ষিকী সম্মেলনের ব্যবস্থাপক মাওলানা আসলাম কাসেমি সাহেবের কাছে নির্দেশনামা প্রেরীত হয় যে, ‘মওদুদি জামাতের বইপত্রের স্টল লাগানোর জন্যে যেই জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা রহিত করা হলো।’
কাজেই সারকথা হলো, দারুল উলূম দেওবন্দ মাসলাকের দাওয়াত দেয় না; কিন্তু আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর ভারসাম্যপূর্ণ মতাদর্শের হিফাজত করে। ফিকাহর চার মাযহাব ভিন্ন ভিন্ন মাসলাক। দারুল উলূম দেওবন্দে প্রতিটি মাসলাক-মতাদর্শের শিক্ষার্থী পড়ে। দাক্ষিণাত্যের শাফেঈ মাযহাবের প্রচুর ছাত্র এখানে পড়ে। কিন্তু দারুল উলূম দেওবন্দের দেড়শো বছরের ইতিহাসে একজন শাফেঈ শিক্ষার্থীও দারুল উলূম দেওবন্দে পড়ে হানাফি হয়নি। কারণ, দাওরা হাদিসের শিক্ষকগণ কখনো মাসলাকের দাওয়াত দেন না।

আরেকটি শিক্ষণীয় ঘটনা

একবার আমি কেরালায় যাই। সেখানে গায়রে মুকাল্লিদদের বিরুদ্ধে একটি বয়ান দিই। আমাকে যিনি দাওয়াত দিয়ে এনেছিলেন, তার নাম হযরত মাওলানা নুহ কাসেমি রহ.। তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি আমাকে ১০ দিন সময় দিন। আমরা আপনাকে দিয়ে এ বিষয়ের ওপর কেরালাতে ধারাবাহিক সেমিনার করাবো।’
আমি মাওলানা নুহ কাসেমিকে বললাম, ‘আপনারা তো শাফেঈ। আপনাদের ফিকাহ গায়রে মুকাল্লিদদের সঙ্গে বেশ মিলে যায়। আপনারা ইমামের পেছনে ফাতিহা পড়েন, তারাও পড়ে। আপনারা রফয়ে ইয়াদাইন করেন, তারাও করে। আপনারা জোরে আমিন বলেন, তারাও বলে। তাহলে তাদের সঙ্গে আপনাদের মতবিরোধ কোথায়?’
উত্তরে মাওলানা নুহ বলেন, ‘গায়রে মুকাল্লিদরা তো আমাদেরকেও মুশরিক বলে। কাজেই প্রোগ্রাম করা জরুরি।
মাওলানা নুহ কাসেমি রহ. এর জীবদ্দশায় আমার দ্বিতীয়বার সেখানে যাওয়া হয়নি।

মতাদর্শকে ধোঁয়াশা থেকে বাঁচিয়ে সংশয়মুক্ত রাখাও জরুরি

হাদিস শরিফে এসেছে,
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
‘ব্যক্তি যে গোষ্ঠীর সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে ওই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হবে।’
যদিও এই হাদিসের মূল আলোচ্য বিষয় الشعائر الدينية (দ্বীনি প্রতীকসমূহ) কিন্তু এ হাদিস থেকে এ কথাও বুঝে আসে যে, হক মাযহাবকে ধোঁয়াশা, সন্দেহ ও পরসাদৃশ্য থেকে বাঁচিয়ে রাখাও জরুরি। ইদানিং যেই শ্লোগান সর্বত্র চাউর হয়েছে যে, ‘দাওয়াত স্রেফ দ্বীনের দিতে হবে; মাসলাকের দাওয়াত দেওয়া যাবে না। মাসলাক ব্যক্তির কাছে প্রণিধানযোগ্য বিষয় মাত্র; এটাকে দাওয়াতের প্রতিপাদ্য বানানো ঠিক নয়।’
তাদের এই শ্লোগান ঠিক নয়। আগের যুগে এ ধরনেরই আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি অনেকের মুখে শোনা যেত যে, সমস্ত ধর্মই ব্যক্তিকে আল্লাহর কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার রাস্তা। তবে কোনো রাস্তা সোজা, আর কোনো রাস্তা চড়াই-উৎরাইয়ে ভরা। কাজেই পৃথিবীর দেড়শো ধর্মের সবকটাই আল্লাহর কাছে পৌঁছিয়ে দেবে, ব্যক্তিকে মুক্তি দেবে।
এ দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে যত সুন্দর ও শুনতে যত শ্রুতিমধুর মনে হোক না কেন; আদতে শতভাগ ভুল। তদ্রূপ উপরের শ্লোগানটিও ভুল। এই বক্তব্য তো তখনই সঠিক হবে, যখন সবগুলো মাযহাবের কেবলা অভিন্ন হবে। এক গ্রাম্য লোক উটের ওপর বসে যাচ্ছিল। এক লোক জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছো? উত্তরে সে বলল, আমি মক্কা যাচ্ছি। তখন প্রশ্নকারী বলল, ‘তুমি কখনই মক্কায় পৌঁছুবে না। কেননা তুমি খোরাসানের পথে চলছো। এ পথ তোমাকে কোনোদিন মক্কায় পৌঁছাবে না।’ এই উপমার আলোকে বুঝুন, এক ব্যক্তি লা-শরিক আল্লাহকে রব স্বীকার করে। তাঁর ইবাদত করে। আরেকজন দু’ খোদায় বিশ্বাস করে। তৃতীয়জন তিন খোদায় বিশ্বাস করে। চতুর্থ জন হাজার হাজার ভগবানে বিশ্বাস করে। এই চারজন কীভাবে এক মঞ্জিলে পৌঁছুবে!
তদ্রূপ তেহাত্তর ফেরকার আলোচনা সমৃদ্ধ হাদিসে শুধু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহকেই ‘নাজাতপ্রাপ্ত’ অভিহিত করা হয়েছে। অবশিষ্ট বাহাত্তর ফেরকাকে ‘জাহান্নামি’ বলা হয়েছে। কাজেই সেসব গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। হকপন্থীদের মতাদর্শ তথা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআর ভারসাম্যপূর্ণ মতাদর্শের ওপর যে ঘরানা অবস্থান করবে, শুধু তারাই নাজাত পাবে। কাজেই বাহাত্তর ফেরকার সাদৃশ্য থেকেও বাঁচা জরুরি। উপরোক্ত হাদিসের ব্যাখ্যা থেকেও এ কথা বুঝে আসে।

মাওলানা সাঈদ আহমদ পালনপুরি হাফিযাহুল্লাহ

নিকট অতীতের শিক্ষণীয় ঘটনা

হযরত মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমি রহ. যদিও বয়সে বড় ও অগ্রগামী ছিলেন; কিন্তু তাঁর জ্ঞান ও যোগ্যতার কারণে তাঁর সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি যখন ফিকহি সেমিনারের ধারাবাহিক কার্যক্রম শুরু করেন তখন প্রথম দিকে আমি সেই সেমিনারগুলোতে অংশগ্রহণ করতাম। চতুর্থ সেমিনারের পর তিনি আমাকে বললেন, ‘আমি দারুল উলূম দেওবন্দে একটি সেমিনার আয়োজন করতে চাচ্ছি। আপনি মুহতামিম সাহেবের কাছ থেকে অনুমতি এনে দিন। যাবতীয় ব্যয় আমিই বহন করব। দারুল উলূমের এক পয়সাও ব্যয় হবে না।’
আমি তখনকার মুহতামিম হযরত মাওলানা মারগুবুর রহমান বিজনুরি সাহেবের কাছে বিষয়টি তুললাম।

তখন হযরত আমাকে জবাব দিলেন, ‘এটি সঙ্গত হবে না। তাঁর সেমিনারে বেরেলভি, গায়রে মুকাল্লিদ, মওদুদি ও উদার মানসিকতার অধ্যাপকগণ অংশগ্রহণ করে থাকে। যদি তারা সবাই দারুল উলুমে আসে তাহলে মানুষের কাছে দেওবন্দি মাসলাক সংশয়পূর্ণ হয়ে যাবে। দুনিয়া আঙুল তুলে বলবে, গুমরাহ ফেরকাগুলোর সঙ্গে দারুল উলূম দেওবন্দের কোনো মতভেদ নেই। সবাই এক দস্তরখানে বসেছে। যেহেতু এ পদক্ষেপের ফলে দেওবন্দি মতাদর্শ ধোঁয়াশা হয়ে যাবে, কাজেই আমি এ অনুমতি দেওয়া সমীচীন মনে করি না।’


আমি মুহতামিম সাহেবের এ অভিমত মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমি রহ. এর কাছে তুলিনি। কারণ, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে আমাকে আর জিজ্ঞেস করেননি। তাঁর ইনতিকালের পর যিনি স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন, তিনিও মতাদর্শিক উদারতার পতাকাবাহক। মরহুম মাওলানার পদ্ধতিতে তিনিও সেমিনার আয়োজন করে চলেছেন। আমি সেই চতুর্থ সেমিনারের পর অন্য কোনো সেমিনারে অংশগ্রহণ করিনি। কারণ, দারুল উলূম দেওবন্দের কোনো শিক্ষকের অংশগ্রহণও দেওবন্দি মতাদর্শকে ধোঁয়াশাপূর্ণ বানিয়ে ফেলবে।

একটি ভুল প্রোপাগান্ডা
কিছু মানুষ এই প্রোপাগান্ডা ছড়ায় যে, দারুল উলূম দেওবন্দ উম্মতকে এক হতে দেয় না। তাদের এই অপপ্রচার মিথ্যা ও অবাস্তব। দারুল উলূম দেওবন্দ হক মাযহাবের মুহাফিজ বা সংরক্ষক। হক পথের পথিকগণ যেন অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে, এজন্যে হক মতাদর্শকে যেকোনো ধোঁয়াশা থেকে বাঁচিয়ে রাখা দারুল উলূম দেওবন্দের দায়িত্ব।
যদি দারুল উলূম দেওবন্দকে এই অভিযোগের কাঠগড়ায় তোলা হয়, তাহলে এই অভিযোগ শেষ অবধি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্তও পৌঁছুবে। কেননা তেহাত্তর ফেরকার আলোচনা সমৃদ্ধ হাদিসে তিনিই সেই বিভাজন এঁকে দিয়েছেন। এই অভিযোগ তো খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত উমরে ফারুক রাদি. পর্যন্তও পৌঁছুবে। কেননা তিনি كُنْتُمْ خَيْرَ أمَّةٍ أخْرِجَتْ لِلنَّاسِ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, خاصة في أصحاب محمد صلى الله عليه وسلم অর্থাৎ ‘এ আয়াতটি শুধু সাহাবায়ে কেরাম রাদি. এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। যদি কিয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত উম্মত উদ্দেশ্য হতো তাহলে আল্লাহ كنتم না বলে أنتم বলতেন।’ উমর রাদি. এরপর বলেন, ‘সাহাবায়ে কেরামের পর যেসব লোক আসবে, তাদের মধ্য হতে যারাই সাহাবায়ে কেরাম রাদি. এর আকিদা-বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডের অনুসারী হবে, শুধু তারাই এ আয়াতের প্রতিপাদ্য হবে।’ (উদ্ধৃতি, হায়াতুস সাহাবা। রচনায় হযরত মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভি রহ.। তৃতীয় অধ্যায়)। কাজেই উমর রাদি.-ও উম্মতের মাঝে বিভাজন করেছেন। তিনিও একই অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন।
একটি প্রশ্ন
উম্মতের এই বিভাজনের কারণে উম্মত দুর্বল হয়। এই বিভাজন ত্যাগ করলে উম্মত এক প্লাটফর্মে আসবে। যা পক্ষান্তরে তাদেরকে শক্তিশালী করবে। কাজেই মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের পথ কী?
এ প্রশ্নের উত্তর হলো, এক্ষেত্রে আমাদেরকে একটি মূলনীতি অনুসরণ করতে হবে। তাহলো, যদি কোনো রাষ্ট্রীয় সমস্যা দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সকল অধিবাসী মিলে বসা উচিত। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় হিন্দু-মুসলিম ঐক্য যার জ্বলন্ত উদাহরণ।
আর যদি উম্মাহ সংক্রান্ত কোনো সমস্যা দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে সকল মুসলিম ঘরানার এক হওয়া উচিত। উম্মাহর নিরাপত্তার স্বার্থে এক কণ্ঠে আওয়াজ তুলতে হবে। মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ড হচ্ছে সেই ঐক্যের উদাহরণ। মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ডের মাঝে কাদিয়ানি ব্যতীত সকল মুসলিম জামাত অন্তর্ভুক্ত।
আর যদি মাসলাক ও মাশরাব তথা মতাদর্শিক মতবিরোধ দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো, নিজ মতাদর্শের ওপর অবস্থান করে অন্যদের সঙ্গে বিরোধ পরিহার করা। এই তৃতীয় সুরত আমাদের আজকের প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়। যদি হক ও বাতিল, আলো ও অন্ধকার, হিদায়াত ও গুমরাহি এক জায়গায় সমবেত হয় তাহলে এর ফলে ক্ষতি শুধু আহলে হকেরই হবে। বাতিল ফেরকা নিজের আহবান জারি রাখবে আর হকপন্থীদের ময়দান সংকুচিত হতে শুরু করবে।
হায়দারাবাদের একটি ঘটনা
একবার আমি হায়দারাবাদে যাই। সেখানকার মাদরাসায়ে আশরাফুল উলূমে অবস্থান করি। আসরের পর প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। একজন আমাকে জামাতে ইসলামি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আমি উত্তরে বলি, ‘তারা পাঁচ কারণে গুমরাহ। (সেই পাঁচ কারণ আমার ‘ইলমি খুতুবাত’ বইয়ে আছে।)
পরদিন ফজর নামাযের পর দশ জনের একটি দল আমার কাছে আসে। তারা বলে, ‘আমরা সবাই এ নগরীতে মিলে মিশে থাকি। আমাদের মাঝে কোনো মতভেদ নেই। আপনার কালকের ওই কথার কারণে মতবিরোধ হচ্ছে।’
আমি বললাম, ‘আমি যদি চুপ থাকি তাহলে আখেরে ক্ষতিটা কার হবে? তোমরা তোমাদের গুমরাহি নিয়মিত ছড়াতে থাকবে। আর অসচেতন মুসলমান তোমাদের জালে ফাঁসতে থাকবে। এই নিরবতার কারণেই তো হকপন্থীদের সংখ্যা কমে। কাজেই আমরা আমাদের হক মতাদর্শের যদিও দাওয়াত দিই না; কিন্তু তার হিফাজত করি। আপনারাই বরং আপনাদের গুমরাহির দিকে দাওয়াত দেন।’
‘লুকমান সাহেব’ নামের এক গায়রে মুকাল্লিদ আলেমের একটি চিঠি দিয়ে আমি আমার কথার ইতি টানছি। সে তার জনৈক বন্ধুকে পত্রে লিখেছে, ‘একজন হানাফিকে আহলে হাদিস বানানো এতো এতো কাফেরকে মুসলমান বানানো থেকে উত্তম।
কাজেই এখন আপনি বলুন, নিজ মতাদর্শের দাওয়াত আসলে কারা দেয়? দারুল উলূম দেওবন্দ দেয়, নাকি গুমরাহ ফেরকাগুলো দেয়?’

স মা প্ত

[মূল : মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরি উসতাযুল হাদিস, দারুল উলুম দেওবন্দ, ভারত
লেখাটি হযরতের সম্প্রতি প্রকাশিত বই ‘জলসায়ে তাযিয়াত’ এর শেষে রয়েছে।]

Leave a comment

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: