শিরোনাম
ফটিকছড়িতে সংবর্ধিত আমিরে হেফাজত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ধর্ম প্রতিমন্ত্রী পদে আজ সন্ধ্যায় শপথ গ্রহণ করবেন জামালপুর-২ (ইসলামপুর) আসনের সংসদ সদস্য ফরিদুল হক খান দুলাল নাগার্নো-কারাবাখে আমরা পরাজিত হয়েছি: আর্মেনিয়ার প্রেসিডেন্ট আল আমিন সংস্থার তিনদিন ব্যাপী তাফসিরুল কোরআন মাহফিল উপলক্ষ্যে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত রামগড় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে ওলামা ঐক্য পরিষদের সৌজন্য সাক্ষাৎ হেফাজতের কমিটি নিয়ে আমাদের সময় পত্রিকার প্রতিবেদন ডাহামিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গাজার উত্তরাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বিমান মুসলিম সভ্যতা বিরোধী মূর্তি নির্মাণের প্রতিবাদ করায় মামুনুল হক ও চরমোনাই পীরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে চরমপন্থী মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ‘মহানবী সা. এর শানে বেআদবি রক্তের বিনিময়ে প্রতিহত করা হবে’: আল্লামা জুনায়দ বাবুনগরী  হাটহাজারী উপজেলাধীন মধ্য মাদার্শায় হেফাজত কর্মীদের উপর মাজারপন্থীদের পরিকল্পিত হামলা : আহত ৪
বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০২:২৩ অপরাহ্ন
add

ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহ.)

কওমি ভিশন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : সোমবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
add

মুফতি মোহাম্মদ এনামুল হাসান


আলেম-উলামাগণ হলেন নবীগণদের ওয়ারিশ বা প্রতিনিধি। সে ধারাবাহিতায় আলেম-উলামাগণ যুগে যুগে মানবজাতির কাছে ইসলামের সুমহান আদর্শ ও সঠিক মর্মবাণী প্রচার-প্রসারে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পথহারা মানবজাতিকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে দিয়েছেন সঠিক দিকনির্দেশনা। বস্তুত আলেম উলামাদের সীমাহীন ত্যাগ তিতিক্ষার কারণেই মানবজাতি আজ ইসলামী আদর্শে আদর্শবান।

আমাদের পাক-ভারত উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার-প্রসারে যে সকল আলেম-উলামা অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে ব্রাক্ষণবাড়ীয়ার কৃতী সন্তান আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহ.) এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আল্লামা তাজুল ইসলাম ছিলেন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ইসলামী ব্যক্তিত্ব, মুফাসসিরে কোরআন, মুহাদ্দিস, শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, আজাদী আন্দোলনের অন্যতম বীর সৈনিক। ইসলামী জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তার পাণ্ডিত্য। বাংলাদেশে ইসলামী আদর্শ, কৃষ্টি-কালচার শিক্ষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তিনি যে প্রোজ্জ্বল অবদান রেখে গেছেন, তা সত্যিই এ দেশের ইসলামপ্রিয় জনতার জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। তিনি তাঁর বহুমুখী প্রতিভা, মেধা ও কৃতিত্বের জন্য আল্লামা তাজুল ইসলাম ফখরে বাঙ্গাল উপাধিতে ভূষিত হন।

জন্ম : ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ভুবন গ্রামে ১৩১৫ হিজরি মোতাবেক ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে মাওলানা আনোয়ার আলী (রহ.) (যিনি সমকালীন যুগে প্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন) এর সন্তান হিসেবে ভূমিষ্ঠ হন আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহ.)।

শিক্ষাজীবন : পিতা মাওলানা আনোয়ার আলী তার পুত্রের বয়স যখন ৮ কিংবা ৯ বৎসর হল তখন তিনি স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করেন। স্কুলে ভর্তি হওয়ার মাত্র ৯ মাসে বালক তাজুল ইসলাম ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত সকল ক্লাসের পাঠ্যবিষয় মুখস্থ করে ফেলেন। স্কুল জীবন শেষে বালক তাজুল ইসলাম স্থানীয় জেঠাগ্রামে মাওলানা আব্দুল করিম এর নিকট প্রাথমিক কিতাবাদি অধ্যয়ন করেন। পরে তিনি শ্রীঘর মাদ্রাসায় ভর্তি হন।

শ্রীঘর মাদ্রাসার পর হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল মাদ্রাসায় ভর্তি হন। বাহুবল মাদ্রাসা থেকে অতি সুনামের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে সিলেটে মাদ্রাসায়ে আলিয়ায় ভর্তি হন। ১৩৩৭-৩৮ হিজরিতে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসার সর্বশেষ পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৩৩৮ হিজরিতে আল্লামা তাজুল ইসলাম বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। দারুল উলুম দেওবন্দে ৪ বছরে তিনি উচ্চপর্যায়ে হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আকায়েদ ও আরবি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। দেওবন্দে শিক্ষাজীবনে প্রতিটি পরিক্ষায় তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন।

দেওবন্দ মাদ্রাসায় তাজুল ইসলাম (রহ.) এর উস্তাদবৃন্দ : দেওবন্দে আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহ.) এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও শিক্ষক ছিলেন সমকালীন বিশ্বের অন্যতম আলেমে দীন আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.), শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.), শাইখুল আদব মাওলানা এজাজ আলী (রহ.) ও মুফতি আজিজুর রহমান (রহ.)। এ ছাড়া শাইখুল ইসলাম সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) এর নিকট তিনি এলমে মারিফত লাভ করেন।

কর্মজীবন : ১৩৪২ হিজরিতে দেওবন্দ থেকে ফিরে এসে আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহ.) সর্ব প্রথম ঢাকা এবং পরে কুমিল্লা জামিয়া মিল্লিয়্যাহয় শাইখুল হাদিস হিসেবে যোগদান করেন। ১৩৪৫ হিজরিতে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসায় প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইন্তেকালের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত দীর্ঘ ৪২ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালে আল্লামা তাজুল ইসলাম ফখরে বাঙ্গাল (রহ.) এর সাথে যারা দীনে ইসলামের কাজ করেছেন তারা হলেন মাওলানা আতহার আলী (রহ.), মাওলানা আব্দুল করীম শায়খে কৌড়িয়া, মাওলানা সিদ্দিক আহমদ (রহ.), মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিন (রহ.), মাওলানা আশরাফ আলী ধরমন্ডলী (রহ.), মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.), মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.), মাওলানা ছফি উল্লাহ চাদপুরী (রহ.), মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব পীরজী হুজুর (রহ.) ও মাওলানা সিরাজুল ইসলাম বড় হুজুর (রহ.) অন্যতম।

রাজনীতিতে ফখরে বাঙ্গাল : ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহ.) ছিলেন শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ। এ দেশের মানুষ যখন হতাশাগ্রস্ত হয়ে তাদের চারিত্রিক অধঃপতনের কারণে সঠিক পথ ভুলে গিয়ে ইসলামী তাহজিব তামাদ্দুনকে বিসর্জন দিয়ে ব্রিটিশদের কৃষ্টি কালচারের প্রতি ঝুঁকে গিয়েছিল তখন পথভ্রষ্ট জাতিকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ছিল সর্বাপেক্ষা বেশী।

দেওবন্দে অধ্যয়নকালে স্বাধীনতা আন্দোলনে হজরত মাদানি (রহ.) এর একান্ত সহচর হিসেবে কাজ করেছেন ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহ.)। ফখরে বাঙ্গাল (রহ.) ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলাদেশের অগ্রগামী নেতা। তিনি পূর্ব পাক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির সহ-সভাপতি এবং তৎকালীন কুমিল্লা জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল কোরআনের আলোকে যে ইসলামী রাজনীতি পৃথিবীতে চালু করে গেছেন, সেই ইসলামী রাজনীতির মাধ্যমে এ দেশের জনগণকে ব্রিটিশবেনিয়াদের হাত থেকে মুক্ত করতে ছাত্র জীবন থেকেই তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

রাজনীতির দীক্ষা: যাদের সান্নিধ্য থেকে তিনি রাজনীতির দীক্ষা লাভ করেন ঐ সকল মহামনীষীগণ হলেন মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ.), আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.), শাখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহ.), মাওলানা হুসাইন আহমদ মদনী (রহ.) প্রমুখ।

ফখরে বাঙ্গাল উপাধি লাভ : আলামা তাজুল ইসলাম (রহ.) দেওবন্দ মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়ে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে এক বাহাসে (তর্কযুদ্ধ) অনুষ্ঠিত হয়। তিনি কোরআন ও হাদিসের আলোকে তথ্যভিত্তিক দলিল এবং অকাট্য যুক্তির দ্বারা কাদিয়ানীদের কাফের প্রমাণ করার পর উপস্থিত জনতা তাকে ফখরে বাঙ্গাল বা বাংলার গৌরব উপাধিতে ভূষিত করেন।

বিশ্ব উলামা সম্মেলনে যোগদান : ১৯৬৪ সালে পূর্বেকার মাজহাবসমূহ ও আয়িম্মায়ে মুজতাহিদিনের পরিবর্তে নতুন মাজহাব ও মুজতাহিদিন গঠন করা প্রসঙ্গে মিশরের রাজধানী কায়রোতে বিশ্ব উলামা সম্মেলনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হতে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে নতুন মাজহাব এবং মুজতাহিদিন নির্বাচনের প্রস্তাবে যুক্তির মাধ্যমে প্রবল বিরোধিতা করেন। তার তথ্যভিত্তিক ও যুক্তির মাধ্যমে নতুন মাজহাব গঠনের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। ফখরে বাঙ্গাল (রহ.) কায়রোতে বিশ্ব উলামা সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে বিশ্বের দরবারে এ দেশের এবং দেশের জনগণের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন। উক্ত সম্মেলনে তিনি ফখরুল উলামা বা উলামাদের গৌরব ও হাফিজুল হাদিস উপাধিতে ভূষিত হন।

ইন্তেকাল : ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহ.) ১৯৬৭ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭১ বৎসর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন তিনি। সারাটি জীবন দীনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন মুসলিম সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাক্তিত্ব। তার বর্ণাঢ্য জীবনটাই ছিল ইসলামের এক অনন্য চরিত্রের সোপান।

যুগ্ম সম্পাদক, ইসলামী ঐক্যজোট,

ব্রাক্ষণবাড়ীয়া জেলা।

 

Leave a comment

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: