শিরোনাম
ফটিকছড়িতে সংবর্ধিত আমিরে হেফাজত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ধর্ম প্রতিমন্ত্রী পদে আজ সন্ধ্যায় শপথ গ্রহণ করবেন জামালপুর-২ (ইসলামপুর) আসনের সংসদ সদস্য ফরিদুল হক খান দুলাল নাগার্নো-কারাবাখে আমরা পরাজিত হয়েছি: আর্মেনিয়ার প্রেসিডেন্ট আল আমিন সংস্থার তিনদিন ব্যাপী তাফসিরুল কোরআন মাহফিল উপলক্ষ্যে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত রামগড় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে ওলামা ঐক্য পরিষদের সৌজন্য সাক্ষাৎ হেফাজতের কমিটি নিয়ে আমাদের সময় পত্রিকার প্রতিবেদন ডাহামিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গাজার উত্তরাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বিমান মুসলিম সভ্যতা বিরোধী মূর্তি নির্মাণের প্রতিবাদ করায় মামুনুল হক ও চরমোনাই পীরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে চরমপন্থী মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ‘মহানবী সা. এর শানে বেআদবি রক্তের বিনিময়ে প্রতিহত করা হবে’: আল্লামা জুনায়দ বাবুনগরী  হাটহাজারী উপজেলাধীন মধ্য মাদার্শায় হেফাজত কর্মীদের উপর মাজারপন্থীদের পরিকল্পিত হামলা : আহত ৪
শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন
add

বিজয় দিবস ও কওমি ভাবনা

কওমি ভিশন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮
add

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী
বাহাত্তর সালের পালিত বিজয়-দিবসকে প্রথম ধরে নিলে এবার ১৬ ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের ৪৭তম বিজয়-দিবস। আর একাত্তরের ১৬ ই ডিসেম্বরকে প্রথম পালিত বিজয়-দিবস ধরলে এবার ৪৮তম বিজয়-দিবস। প্রতি বছর বিজয়-দিবস আসে, যায়। এদিন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিটি জনপদে এক অনন্য অনুভব কাজ করে মননে-মননে। যখন-ই বিজয়-দিবস আসে, ফিরে আসে ১৯৭১ সালের রক্তমাখা স্মৃতি আর সাত কোটি মানুষের মুক্তির সংগ্রামের হাজার ছবি।
ইসলামে দিবস পালনের কোন গুরুত্ব নেই। এ পৃথিবীতে অসংখ্য নবী-রসূল আলাইহিমুসসালাম আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে এসেছেন, আবার নির্দিষ্ট সময়-শেষে চলেও গেছেন। তাঁদের প্রদর্শিত শিক্ষায় না তাঁদের জন্মে বা ইন্তিকালে দিবস-স্মরণের উল্লেখ ছিলো, না তাঁদের অনুসারীবৃন্দ নিজ-নিজ নবী-রসূলগণের জন্ম বা ইন্তিকাল নিয়ে কোন দিবস পালন করেছেন। ইতিহাসে বা সীরাতে এমন কোন প্রমাণ নেই। যেমন ধরা যাক, রসূলুল্লাহ সা.-এর কথা। আল্লাহর রসূল সা. এ ধরায় এসেছেন নবুওয়্যাতের শিক্ষা নিয়ে আবার আল্লাহর ইচ্ছায় ওয়াফাতও হয়েছে। হযরতের জীবদ্দশায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে যার উল্লেখ কুরআনে করীমে রয়েছে। হযরত নবী করীম সা. জীবদ্দশায় কখনও কোন সাহাবীকে তাঁর জন্ম, ওয়াফাত, প্রথম কুরআন নাযিলের ঘটনা, বদর-অহুদের জিহাদ, মক্কা বিজয় ইত্যাদিকে স্মরণ বা মাতম করে কোন দিবস-পালনের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন বা নির্দেশনা দিয়েছেন–এমন প্রমাণ নেই। হযরতের ওয়াফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদীন যাঁদের অনুসরণ উম্মাহর উপর সর্বসম্মতভাবে নির্দেশিত, তাঁরা যথাক্রমে: হযরত আবূ বাকার সিদ্দীক রজি., হযরত উমার ফারুক রজি., হযরত উসমান গনী রজি. এবং হযরত আলী রজি. খলিফা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের অনুসরণীয় আমলে বা খিলাফাতকালে না তাঁরা রসূলুল্লাহ সা.-এর জন্ম বা ওয়াফাত দিবস পালন করেছেন, না পালনের অনুমতি দিয়েছেন। “عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدي” ( তোমরা আমার সুন্নাত এবং আমার পরবর্তী সৎপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে ধারণ কর।)–পবিত্র হাদীসের এই স্পষ্ট নির্দেশনা থেকে প্রতীয়মান হয়, ফী-বছর কোন নির্দিষ্ট দিবস পালনের সুযোগ ইসলামে নেই। নির্দিষ্ট দিনে পালিত হয় কেবল পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। তাও উৎসব হিসাবে নয়, ইবাদাত হিসাবে। সেগুলো কোন বিশেষ ঘটনা উপলক্ষ্যেও পালিত নয়, পালিত হয় মহান আল্লাহর হুকুম হিসাবে। সূরাহ আল ইমরানে কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণার– ” ياايها الذين آمنوا اتقوا الله حق تقاته , ولا تموتن إلا وأنتم مسلمون” ( হে মু’মিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করার মত ভয় কর এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না।) বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ একজন মু’মিনের জন্য রাখা হয়নি। সুতরাং, সাংস্কৃতিক হোক, বিশ্বাসগত হোক–ধর্মনিরপেক্ষ হবার বিন্দুমাত্র জায়গা রাখা নেই আল্লাহর পক্ষ থেকে। উলামায়ে কেরাম বলেন: ‘মুসলিম’ হয়ে মৃত্যবরণের শর্ত হলো, জীবনটাকে আপাদমস্তক মুসলিম করে নেয়া। যারা বলেন, কোন নির্দিষ্ট দিবস-পালন নিছক উৎসবমাত্র–তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন ভিত আছে বলে দেখাতে পারবেন না। উৎসবের পেছনে কিছু না কিছু বিশ্বাস থাকেই। বিশ্বাস থেকেই আচারের উদ্ভব। এখন প্রশ্ন হলো, বিশ্বাসটা কি? উত্তর যাই হোক, বর্ণিত বিশ্বাসের সাথে ইসলামে অনুমোদিত বিশ্বাসের যদি বিরোধ হয়, ইসলামের অনুমোদিত আচারের সাথে যদি কারও কোন অনুশীলিত আচারের বিরোধ হয়, তবে সেসব বিনাবাক্যে একজন মুসলিমের জন্য পরিত্যাজ্য। সেটা যে কোন ব্যাখ্যারই হোক, প্রত্যাখ্যানযোগ্য। সঙ্গতকারণে, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ কোন সংস্কৃতি কোন মুসলিমের জন্য অনুমোদিত নয়।

হাল আমলে বিজয়-দিবসের মতো কিছু বিষয় নিয়ে কওমীমহলে ভিন্নভিন্ন চিন্তা ও চেতনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বলতে গেলে কওমী-জগতের চিরাচরিত রক্ষণশীলতাকে অতিক্রম করে নতুন-প্রজন্মের কিছু ছাত্র বিজয়-দিবস, স্বাধীনতা-দিবস ইত্যাদি নিয়ে ব্যতিক্রম ভাবছে নিজেদেরকে সচেতন ও আধুনিক প্রমাণের মানসে। এ ধরনের কেন হচ্ছে?– বিষয়টি জানা বিশেষত কওমী-জগতের সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। প্রথম কথা হলো, আমাদের এখানকার কওমী-মাদরাসার তরুণ আলিমবৃন্দ এবং ছাত্রদের বাংলাদেশ সম্পর্কে জানাশোনা হয়তো শূণ্যের কাছাকাছি বা ভাসাভাসা। জাতীয় দিবসগুলোকে কেন্দ্র করে কওমীদের এক ধরনের অগভীর আচারের তুলনায় নির্ভরযোগ্য ইতিহাস জানার আগ্রহটা যদি অধিকতর হতো তবে জাতির জন্য অনেক ফলপ্রদ হতো। সন্দেহ নেই, দেশের বিভক্ত আর বিষাক্ত রাজনীতির দোষে দুষ্ট জাতীয় ইতিহাসও আজ বিভক্ত ও বিষাক্ত। প্রশ্ন হতে পারে, এমন নেতিবাচক পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য ইতিহাসচর্চা কীভাবে সম্ভব? উত্তরে বলতে হয়, প্রথমত ব্যক্তির ইচ্ছা উদগ্র হলে এবং অন্বেষার মানসিকতা নিয়ে সঠিক ইতিহাসের সন্ধানে লিপ্ত ব্যক্তি আজ হোক কাল হোক লক্ষ্যতে পৌঁছুবেই। বেদনাত্মক বিষয় হলো, আমাদের দারসগুলোতে এগুলোর জন্য আলাদা সময় বের করে পড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় না, হলে কওমী-ছাত্রদের মনে অনুভব আর উপলব্ধির সৃষ্টি হতো। সঠিক ইতিহাস প্রাপ্তির জন্য নির্ভরযোগ্য লেখক বের করে তাঁদের রচনাগুলোকে মন্থন করার বিকল্প নেই। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে সংকলিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র’ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের জাতীয় ইতিহাস জানা কওমী-জগতের জন্য এক কথায় অনিবার্য। ইতিহাসের এই বিস্মৃতির জন্যই সেক্যুলার ও বামপন্থীদের দেয়া ভিত্তিহীন অভিযোগগুলোর যথাযোগ্য জবাব আমরা দিতে পারি না। না পারার কারণে, ভিত্তিহীন অভিযোগ মানুষকে বিভ্রান্ত করে চলেছে। জাতীয়ভাবে কওমীদের অপমান করার ও ছোট করে রাখার আবহ তৈরি হয়। স্বীকৃতির আইন পাশের পর জাতীয় সংসদে কওমীদের জন্য এমনসব বিশেষণ উচ্চারণ করা হয়, শুনে মনে হয়েছে দীর্ঘদিন কওমীদের ভিক্ষার আর্তনাদ শুনতে-শুনতে শাসকবর্গ দুয়ার থেকে বিদায় করতে ক’মুঠো চাল দিয়ে কওমীদের ‘সনদ’ দিলো। ‘অবহেলিত’, ‘মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন’ ইত্যকার শব্দগুলো কওমী-জগতের জন্য ছিলো শেষ-দরোজার অপমানকর। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কওমী-জগৎ থেকে এসবের কোন প্রতিবাদ আসেনি। ২০১৩ সালের শাপলা গণহত্যার পর সেক্যুলার, বাম ও পক্ষপাতদুষ্ট মিডিয়া হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকদেরকে প্রতিক্রিয়াশীল, স্বাধীনতার বিরোধীশক্তি, পাকিস্তানপন্থী ইত্যাদি শব্দে দিয়ে বক্তব্য রাখার স্মৃতি এখনও মুছে যায়নি। দৃষ্টান্তসরূপ ২০১৩ সালের ১১ ই মে মানবজমিন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরের উল্লেখ করতে হয়। খবরে বলা হয়: অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, নারী-পুরুষ সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ চাই–এই স্লোগানে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদী নারী গণসমাবেশে বক্তারা বলেন, হেফাজতে ইসলামের উত্থাপিত ১৩ দফা মেনে নেয়া যায় না। নারীরা বাংলাদেশের উন্নয়নে অবদান রেখেছে, রাখছে এবং ভবিষ্যতে রাখবে। মাদরাসার হুজুরেরা দান খয়রাতের ও যাকাতের টাকায় চলেন। তারা দেশের উন্নয়নে কোন অবদান রাখেন না। হেফাজতে ইসলাম নারীদেরকে টেনে ধরে রাখতে পারবে না। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে এ সমাবেশ হয়।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, ওদের চেয়ে আমরা কওমীরাই নিজেদেরকে হীন বলে পর্যবসিত করার মানসকিতাকে ধারণ করি। কওমীরা জানতে চায়নি, রাষ্ট্রের জন্য তাঁদের কী অসামান্য অবদান; বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নে কওমী-জগতের কী ত্যাগ। দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে, মানবসম্পদ উন্নয়নে, সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কওমী-জগৎ যে অসামান্য জাতীয় অবদান রেখে আসছে তা দেশের অন্য কোন সংস্থাও করতে পারেনি–এ খবর কওমী-জগৎ জানে না। এসবের বিশদ বিবরণ ঢাকা থেকে প্রচারিত অনলাইন পোর্টাল ইনসাফ ডট কমে ‘কওমী-জগৎ ও অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান’ শিরোনামে ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়। পরে গবেষণা-প্রবন্ধটি ‘কওমী জগৎ হেফাজতে ইসলাম ও প্রসঙ্গকথা’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে দু’টি ভিত্তিহীন অভিযোগ সেক্যুলার ও বামমহল থেকে করা হয় অহরহ। সে কারণে তারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের আড়ালে ইসলামী রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করার সমূহ চেষ্টা চালায়। ১৯৭৫ পর্যন্ত ষড়যন্ত্রকারীদের চেষ্টা আধিপত্য বিস্তার করে রাখে। প্রেসিডেন্ট জিয়া দেশের দায়িত্বভার নেয়ার পর ইসলামী রাজনীতির দ্বার উম্মুক্ত হয়। সেক্যুলার ও বামমহল দেশের আলিম-সমাজকে প্রধানত স্বাধীনতাবিরোধী, পাকিস্তানপন্থী ও মধ্যযুগীয় মৌলবাদী বলে প্রচার চালায়। আরেকটি অভিযোগ হলো: তাঁরা জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত নয়। ষড়যন্ত্রকারীদের দেয়া ‘স্বাধীনতাবিরোধী’র তকমা নিয়ে আজ এখানে কিছু কথা বলতে হচ্ছে যা আমাদের কওমী-সন্তানদের মাথায় রাখা দরকার। প্রথমেই একটি কথা মনে রাখা জরুরী যে, যারা দেশের আলিম-সমাজের উপর পাইকারীভাবে এসব দোষ চাপান তাদের ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে, তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি এবং পুরো নয় মাস ভারতের মাটিতে নিশ্চিন্তে সময় কাটিয়েছেন। আর ১৬ ই ডিসেম্বরের পর দেশে ফিরে নিজেদেরকে ভয়ানক মুক্তিযোদ্ধায় পরিচিত করার চেষ্টা করেন। যেমন ধরুন, মুক্তিযুদ্ধে বিএলএফ বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের কথা। এরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয় বিডিএফ বা বাংলাদেশ ডিফেন্স ফোর্স। বিএলএফ যারা ‘মুজিববাহিনী’ হিসাবে সর্বাধিক পরিচিত ছিলো, তারা ভারতের গোয়েন্দা-প্রধান জেনারেল সুজন শিং উবানের তত্ত্বাবধানে ভারতের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ নেয় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে। এই বাহিনী দেশে আসে ১৯৭১ সালে ১৬ ই ডিসেম্বরের পর। তখন মুক্তিযুদ্ধ শেষ। এরা বেশির ভাগই ছিলো বাম চিন্তাধারার। ভারত তার বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বিশেষ কাজের জন্য তৈরি করে। শ্রুতি ও অভিযোগ দু’টোই আছে: এরা দেশে এসে বেশ কিছু স্বাধীনচেতা মুক্তিযোদ্ধা বিশেষত যাঁরা ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী বলে মনে হয়েছে তাঁদেরকে এবং অনেক আলিমকে হত্যা করেছে। তারা বিভিন্ন কওমী মাদরাসায়ও হামলা চালায়। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমাণ্ডার মরহুম মেজর (অব.) আব্দুল জলীল মুজিববাহিনী সম্পর্কে তাঁর লেখা ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ পুস্তিকায় বলেন, ” মুজিববাহিনী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পূর্বেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। তাদের দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্যই বলা চলে যে, সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে তাদের রক্ত ঝরাতে হয়নি। তাদের অভিজাত রক্ত সংরক্ষিত করা হয়েছিল স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত ঝরানোর লক্ষ্যে।” (পৃ: ৪৪, ইতিহাস পরিষদ সাভার, ঢাকা, তৃতীয় প্রকাশ, ১৯৯০) বিশেষ করে, বামচিন্তার সুপরিচিত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানকে গুম করে হত্যার অভিযোগ আছে মুজিববাহিনীর বিরুদ্ধে। জহির রায়হানের স্ত্রী চিত্রনায়িকা সুচন্দা চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বকোণে এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন: যারা সেদিন জহির রায়হানকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলো, তারা কেউ অবাঙ্গালী ছিলো না, কয়েক
জন বাঙ্গালী ছেলে ছিলো। সেই মুজিববাহিনীর ‘চার খলিফা’ নামে খ্যাত ছিলেন যথাক্রমে: সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদ। অথচ এরাই স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানী সেজে জাতিকে বিভক্ত করার সব কলাকৌশল গ্রহণ করে।

মুক্তিযুদ্ধে আলিম-সমাজের ভূমিকা নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের অপপ্রচারের আরেক দিক হলো: তাঁরা যুদ্ধকালীন সময়ে পাকবাহিনীর সাথে শান্তিকমিটির মাধ্যমে সম্পর্ক রেখেছিলেন। কথাটি ব্যাপকহারে যেমন সত্য নয়, তেমনি পুরোপুরি অবাস্তবও নয়। যারা যুদ্ধকালীন সময়ে সীমান্ত পাড়ি দেন এবং স্বাধীনতার পর দেশে পা রাখেন তারা এ ধরনের অপবাদ দিতে পারেন কিন্তু যাঁরা সীমান্ত পাড়ি না দিয়ে জন্মভূমিকে পাহারা দিয়েছিলেন তাঁদের অনুভূতি আর ভূমিকা নিয়ে কথা বলার অধিকার অনুপস্থিতদের কতোটুকু আছে–তা প্রশ্নের দাবিদার। এখানে প্রথমে বিবেচনায় নিতে হবে পাকবাহিনীর বেপরোয়া দমনস্পৃহাকে। তাদের সামনে তখন হত্যা, ধর্ষণ আর নির্যাতন ছাড়া অন্য কোন পথ জানা ছিলো না। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি, তারা পাকবাহিনীর ভয়াবহতাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন না। আমরা স্বচক্ষে সে-সবের কিছু অংশ দেখার সুবাদে বুঝতে পারি পাকবাহিনীর সাথে কৌশলগত সম্পর্কের যৌক্তিকতা। পূর্ব-পাকিস্তানে প্রবেশ করেই পাক-বাহিনী যেভাবে গণহত্যা চালাতে শুরু করে তা আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ঐ সময় পাকবাহিনীর হাত থেকে কমপক্ষে নিজনিজ এলাকার মানুষজনকে প্রাণে রক্ষা করা প্রথম ফরয হয়ে দাঁড়ায়। যেহেতু আলিম-সমাজ ও সমাজের গণমান্য ব্যক্তিবর্গ স্বদেশকে, স্বদেশের মানুষকে ভালবাসেন, তাই পাকবাহিনীর আক্রমণ থেকে মানুষকে বাঁচাতে শান্তিকমিটির মাধ্যমে একটি কৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এখানে মূলত পাকবাহিনীর সাথে দহরম-মহরমের কিছু ছিলো না। দেশের আলিম-সমাজের একটি অংশ পাকবাহিনীকে বুঝিয়ে, প্রয়োজনে অভিনয় করে অনেক মানুষকে প্রাণে বাঁচান। এটা তাঁদের দেশপ্রেমের অনন্য নযীর। অথচ মুজিবাহিনীর ভারত-ফেরত সদস্যরা মানুষের জানমালের হেফাজতে এগিয়ে আসা লোকগুলোকেই হত্যা-নির্যাতন করে। বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রেমীদের অনেকেই হুমায়ুন আহমেদের কথা জানেন। অনেকে তার ভক্তও। পারিবারিকভাবে তার মরহুম নানাও ছিলেন এলাকার শান্তি কমিটির সভাপতি। এ বিষয় এক প্রশ্নের উত্তরে হুমায়ুন আহমেদ বলেন, “আমার নানাজান দীর্ঘদিনের মুসলিম লীগার ছিলেন। আমাদের পারিবারিক জীবনে তখন চলছে ভয়াবহ দুঃসময়। বাবাকে পাকিস্তানী মিলিটারিরা গুলি করে হত্যা করেছে। নানা বহু কষ্টে আমাদের সুদূর বরিশাল থেকে উদ্ধার করেছেন কয়েক দফা চেষ্টার পর। তাঁর উপস্থিতিতে তাঁকে শান্তি কমিটির সভাপতি করা হয়নি। তিনি মানা করতে পারেননি আমাদের কথা ভেবে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আমাদের দু’ভায়ের জীবন তখন হুমকির মুখোমুখি। তার পরও শান্তি কমিটিতে যোগদানের ব্যাপারটি আমার মা এবং মামারা সমর্থন করেননি। আমি জানি, আমার নানা শান্তি কমিচিতে থাকার সময় মিলিটারিদের বুঝিয়ে শুনিয়ে কত মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। আমি তা নিজ চোখ দেখেছি, আর যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁরা জানেন। অথচ নিশ্চিত মৃত্যু থেকে ফিরে আসা কিছু লোক নানাজানের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ান। তাঁকে জীবন দিতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। তাঁর মতো অসাধারণ একজন মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মারা গেলেন, এই কষ্ট ইহজীবনেও ভোলা যাবে না আমার। অথচ মিলিটারিরা নানাকে বিশ্বাস করতে পারত না। প্রায়ই বাসায় এসে হাজির হত। সার্চ করত। আমি আমার নানার পক্ষে সাফাই গাইছি না। আমার সাফাইয়ের তাঁর কোন প্রয়োজন নেই।” ( ঘরে বাইরে হাজার প্রশ্ন, পৃ: ৬৪, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৪, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা) পাঠক আশা করি বুঝতে পারছেন, যুদ্ধকালীন সময়ে শান্তি কমিটিতে যোগ দেয়া সর্বক্ষেত্রে পাকবাহিনীর জুলুম-নির্যাতনকে সহযোগিতা ছিলো না। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেশের মানুষকে প্রাণে বাঁচাতে সচেতন ব্যক্তিবর্গের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল ছিলো। আর যারা অপবাদ দিচ্ছেন তারা মূলত ক’জন মানুষকে বাঁচিয়েছেন অথবা হত্যা করেছেন সেসবের হিসাব পাওয়া গেলে আসল ছবিটা পরিস্কার হতো।
সেক্যুলারদের আরেকটি অপপ্রচার হলো দেশের আলিম-সমাজ পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিলেন ১৯৭১ সালে। ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক বিশ্লেষণগুলো জানা থাকে না বলে আমাদের অনেকেই এ ধরনের অপপ্রচারে আহত হই। এখানে প্রথমেই একটি প্রশ্নের সমাধান নিতে হবে। তা হলো: আলিম-সমাজ কি ২৫ শে মার্চের আগে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন, না কি পরে? যদি বলা হয় আগে, তবে আসুন এবার তথ্যে যাওয়া যাক। বলাবাহুল্য, পাকবাহিনী কর্তৃক গণহত্যা সংঘটিত হয় ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের কালোরাত্রি থেকে। স্বভাবতই, ২৫ শে মার্চ অবিভক্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রের যেমন অঘোষিত সমাপ্তি, তেমনি ২৬ শে মার্চ নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শুরু। অর্থাৎ, ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত আমরা ছিলাম সর্বাংশে পাকিস্তানী নাগরিক; আমাদের রাষ্ট্রের পরিচয় ছিলো পাকিস্তান। ২৬ শে মার্চ থেকে পূর্বপাকিস্তানের মানুষ তো বটেই, লতাপাতা পর্যন্ত নিজেদেরকে আর পাকিস্তানী ভাবতে পারেনি। ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাবৎ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ নিজেদেরকে পাকিস্তানীই মনে করেছেন, তাঁরা পাকিস্তানপন্থী ছিলেন রাষ্ট্রীয় অর্থে। তাই, এর পূর্বের সকল ভাষণের শেষে শেখ মুজিবুর রহমান ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতেন। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের আগে বিবিসি’র এক সাংবাদিক শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রশ্ন করেন: Do you mean independent? অর্থাৎ, আপনি কি স্বাধীনতার কথা বলছেন? জবাবে তিনি বলেন: No, I don’t that mean. অর্থাৎ, না, আমি সে-কথা বলছি না। তা’ছাড়া, পশ্চিম পাকিস্তানের স্বনামধন্য আইন-বিশেষজ্ঞ আহমাদ রেজা কাসূরী তাঁর সুপরিচিত গ্রন্থ ‘ইধার হাম উধর তুম’-এ লিখেছেন: তিনি ২৫ শে মার্চের আগেই পূর্বপাকিস্তান সফর করে এখানকার মানুষের সাথে কথা বলেছেন। তাঁর কথায়: ২৫ শে মার্চের আগ পর্যন্ত যেখানে পূর্বপাকিস্তানেের সকল মানুষ ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন, ২৫ শে মার্চের পরে সেখানে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের পক্ষে আর কেউ ছিলেন না। তাহলে, আমরা কী বুঝতে পারলাম? ২৫ শে মার্চের আগে এখানকার আলিম-সমাজ তো বটেই, সবাই পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। ২৫ শে মার্চের রাতের গণহত্যার পর থেকেই এদেশের আলিম-সমাজসহ সকলেই স্বাধীনতাপন্থী হয়ে যান।
১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানেও ‘বাংলাদেশ’র পরিচয়-বর্ণনায় ‘The territory of the Republic’ শিরোনামে বলা হয়:
“The territories which immediately before the proclamation of independence on the 26th day of March, 1971 constituted East Pakistan and the territories referred to as included territories in the Constitution (Third Amendment) Act, 1974, but excluding the territories referred to as excluded territories in that Act; and such other territories as may become included in Bangladesh.”
(১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা-ঘোষণার অব্যবহিত পূর্বে যে সকল এলাকা লইয়া পূর্ব পাকিস্তান গঠিত ছিল এবং সংবিধান (তৃতীয় সংশোধন) আইন, ১৯৭৪-এ অন্তর্ভুক্ত এলাকা বলিয়া উল্লিখিত এলাকা, কিন্তু উক্ত আইনে বহির্ভূত এলাকা বলিয়া উল্লিখিত এলাকা তদবহির্ভূত ; এবং যে সকল এলাকা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সীমানাভুক্ত হইতে পারে।) স্পষ্টতই বোঝ যায়, ২৬ শে মার্চের আগে যেমন বাংলাদেশ ছিলো না, তেমনি সেদিন থেকে এদেশ আর পাকিস্তান ছিলো না। সুতরাং, নির্দ্বিধায় বলা যায়, ২৫ শে মার্চের আগে অন্যান্য সবার মতো আলিম-সমাজও স্বাভাবিকভাবে পাকস্তানপন্থী ছিলেন আর ২৬ শে মার্চ থেকে স্বাধীনতাপন্থী হয়ে যান। আলিম-সমাজ কখনও পাকিস্তানের জুলুম-নির্যাতনকে সমর্থন করেননি। বরঞ্চ, এদেশের বামপন্থীরা: যারা আওয়ামী লীগকে ভেতর থেকে ধ্বংস করেছে, তারা যখন মুক্তিযুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলে আখ্যায়িত করে তখনও আলিম-সমাজ স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন।
বাকি প্রশ্ন থাকলো, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ভূমিকা নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশপ্রেমী আলিম-সমাজ এদেশে থেকে ইসলামী শিক্ষার কেন্দ্র মাদরাসাগুলো রক্ষা করেছেন, পাহারা দিয়েছেন। সেদিন যদি তাঁরা মাদরাসাগুলোকে রক্ষা না করতেন তবে এদেশে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে নাস্তিক্যবাদের আক্রমণে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিতো। ইসলামের পক্ষে কথা বলার, মুসলিম-সমাজের স্বকীয়তা রক্ষা করার কথা বলার কেউ থাকতো না। যারা মুক্তিযুদ্ধকে ইসলামের প্রতিপক্ষ হিসাবে উপস্থাপন করতে চায়, তারাই কেবল মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আলিম-সমাজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তারা চেয়েছিলো, মসজিদ-মাদরাসা এদেশ থেকে উঠে যাক; এদেশ নাস্তিক্যবাদের চারণভূমি হোক। আলিম-সমাজ নাস্তিক্যবাদীদের সেই চেষ্টাকে রুখে দিয়ে এদেশের স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলেছেন।
এবারের বিজয়-দিবসে কওমী-ভাবনা নিয়ে কথা বলছিলাম। সচরাচর যে চেতনা বা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এদেশে এখন বিজয়-দিবস পালিত হয় সেটাকে অনুসরণ করার রীতি কওমী-জগৎ গ্রহণ করতে পারে না নীতিগত কারণে। আগেই বলে এসেছি, বছর-বছর নির্দিষ্ট দিনে কোন দিবস পালন ইসলামে সমর্থিত নয়। তবে ঘটে যাওয়া কোন দিনের ঘটনা নিয়ে জাতিকে উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির পানে, নৈতিক চরিত্র-গঠনে, স্বাধীনতা রক্ষার অতন্দ্র-প্রহরী হিসাবে কর্তব্য পালনে আলোচনা অনুষ্ঠান, স্মরণসভা, নির্দেশনা প্রদান ইত্যাদিতে বাধা নেই। এখানে জাতীয় স্বার্থ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দেশের কওমী-জগৎ এ কাজটি করতে পারেন সোৎসাহে। বর্তমানে বিজয়-দিবস পালনের যে সংস্কৃতি দেশে প্রচলিত–তা কওমী-জগতের জন্য কোনভাবেই অনুমোদনযোগ্য হতে পারে না। এখনকার বিজয়-দিবসে কিছু বিষয়কে প্রধান করে তোলা হয় যা কোন আদর্শিক অর্থে একটি বিজয়-দিবস স্মরণের মৌলিক ও অনুসরণযোগ্য চেতনাকে প্রতিনিধিত্ব করে না। প্রধমত, বিভক্ত চেতনা। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শিক্ষণীয় কী, মুক্তিযুদ্ধের সুফল কি করে রক্ষা করা হবে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে আগামী বাংলাদেশ গড়ার পন্থা চিহ্নিত করার পরিবর্তে কে কি করেছে না করেছে, কারা স্বাধীনতার পক্ষে বা বিপক্ষে, কে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে কি দেয়নি ইত্যাদি বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয় একতরফা। এগুলো নিয়ে রাজনৈতিক বিবাদ হয়েছে বহু, এখনও হচ্ছে। কেবল এসব আলোচনায় দেশের কী লাভ হচ্ছে–তা ভাবা হচ্ছে না। একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী খ্যাত ব্যক্তিবর্গ আর মিডিয়া এ ধরনের আলোচনাকে উস্কে দিয়ে কাদের স্বার্থ রক্ষা করেন, তা পরিস্কার হওয়া দরকার। দ্বিতীয়ত, প্রচলিত বিজয়-দিবসের প্রধান উপজীব্য : পাকিস্তান-বিদ্বেষ। ভারতাশ্রিত একশ্রেণীর সেক্যুলারদের মৌলিক খাদ্য যেন বিষয়টি। বিজয়-দিবসের যাবতীয় অনুভুতি হিসাবে দেখাতে চান পাকিস্তান-বিদ্বেষকে। শুধু তাই নয়, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ছলে-বলে-কৌশলে, সাহিত্যচর্চায়, ইতিহাসচর্চায়, শিশু-সাহিত্যে, শিশু-কার্টুনে পাকিস্তান-বিদ্বেষকে প্রবিষ্ট করাতে সচেষ্ট তারা। প্রশ্ন হলো, এতে কী অর্জিত হচ্ছে? ‘৭১-এর ভূমিকার জন্য যদি পাকিস্তান-বিদ্বেষকে হালাল করা যায়, তবে চীন ও আমেমেরিকাও তো ছিলো আমাদের স্বাধীনতার বিপক্ষে। সৌদি আরবও ছিলো পাকিস্তানের সমর্থনে। তাহলে, অন্যদের বেকসুর খালাস দিয়ে কেবল পাকিস্তানের উপর পরওয়ানা জারি কেন? এ কেমন ধরনের নীতি?”৭১-এ স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করার সময় অনেক সম্পদ আর পাকসেনাদের অস্ত্র লুট করে নিয়ে যায়। সেগুলো তো আমাদের ছিলো। সে-সবের বিরোধীতার কথা বিজয়-দিবসে বলা হয় না কেন? তা’ছাড়া, মুসলানদের মধ্যে এ ধরনের অভ্যন্তরীণ বিদ্বেষ ইসলাম কর্তৃক কখনও সমর্থিত নয়। পবিত্র কুরআন বিশ্বের তাবৎ মুসলিমকে এক-ই মিল্লাতের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। এর বাইরে যাবার সুযোগ নেই। পাকিস্তান আমাদের উপর গণহত্যা চালিয়েছে, অর্থনৈতিক শোষণ চালিয়েছে, উন্নয়ন বঞ্চিত করে অনুন্নয়নের যাঁতাকলে পিষেছে–সব সত্য। কিন্তু পাকিস্তান অমুসলিম রাষ্ট্র নয়। পাকিস্তানের মুসলিম-জনতা ‘৭১-র ঘটনার জন্য দায়ী নয়, দায়ী প্রশাসন ও সেনা কর্তৃপক্ষ। সে কারণে দূরদর্শীতার পরিচয় দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান তাজ উদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে ভারতীয় লবির প্রবল আপত্তি উপেক্ষা করে স্বাধীনতার পর পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ইসলামিক দেশগুলোর (ওআইসি) সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। বিষয়টি মনে রাখা দরকার।
বিজয়-দিবস পালন নিয়ে কওমী-জগতের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী থাকা অনিবার্য। কারণ, কওমী-জগত তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ কোন প্রতিষ্ঠান নয় যে, যখন যাই পাবে বাছবিচারহীনভাবে সেটাকে সংস্কৃতি হিসাবে গ্রহণ করবে। এসব প্রাসঙ্গিক কথা আগেই বলে এসেছি। কওমী-জগৎ বাস্তবতার সাথে বিশ্বাস করে: এদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এদেশের নব্বই শতাংশ মানুষ মুসলমান। কওমী-জগৎ এও বিশ্বাস করে, এদেশের স্বাধীনতার জন্য সংখ্যার দিক থেকে মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে, রক্ত দিয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, ভাই-বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন হারিয়েছে। তাঁরা কখনোই তাঁদের মুসলিম জাতিসত্ত্বাকে, জীবনবিধান হিসাবে ইসলামকে ভুলে যাননি। সেই অনুভুতি থেকে তাঁরা অন্যায়-অবিচার আর জুলুমের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রত্যয়ে ৭১-র স্বাধীনতা-সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাই, এদেশের স্বাধীনতারক্ষায় ইসলামী মূল্যবোধচর্চা, সাথেসাথে অমুসলিম সংখ্যালঘুদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে নিশ্চিতকরা বাংলাদেশের ভবিষ্যতকে কওমী-জগৎ সমর্থন ও প্রত্যাশা করে। স্মরণ রাখতে হবে, পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে আমাদের বিদ্রোহ ছিলো কেন? যেসব কারণে এদেশের মানুষ স্বাধীনতার সংগ্রাম করে, সে-সব কি স্বাধীনতার পর দূরীভূত হয়েছে? না হলে, কাদের কারণে হয়নি?–এসব উত্তর কি খোঁজা হয়েছে? ওখানে তো কওমী-জগতের কোন সদস্য ছিলো না। স্বাধীনতার পর থেকে কারা ক্ষমতার স্বাদ চেটে আসছে? জনগণকে স্বাধীনতার আস্বাদ দিতে না পারার শাস্তি কি শাসকেরা পেয়েছে স্বাধীন এই দেশের কোন আদালতে? আমাদের প্রচলিত বিজয়-দিবসে কি কখনও এসব প্রশ্ন ওঠে? না, তা হবে কেন? এখন বিজয়-দিবস মানে সরকারের আত্মপ্রশংসা, জাতীয় পতাকার রঙে পোষাক পরে দেশপ্রেমের ন্যাকামি করা, যত্রতত্র নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের রেকর্ড বাজানো, হিন্দী গানের মূর্ছনা তোলা ইত্যাদি ছাড়া আর কি? এই যদি হয় বিজয়-দিবস পালন, তবে কওমী-জগৎ এধরনের অসারতায় বিশ্বাস করে না। কওমী-জগৎ বাস্তবতার নিরিখে কর্মমুখর কর্তব্যে বিশ্বাসী। তাই, বিজয়-দিবস নিয়ে কওমী-জগতের অনুভব, দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী।
আমাদের কথা হলো, বিজয়-দিবসের স্মরণে একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, বিভক্ত রাজনৈতিক চেতনা যা বারবার প্রতিহিংসার জন্ম দিচ্ছে; আন্তর্জাতিক বিশ্বে আমাদেরকে জাতি হিসাবে লজ্জিত করছে; রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে ; জনগণের মৌলিক সমস্যাকে বিভ্রান্ত করছে–পরিবর্তন করতে হবে। আধুনিক বিশ্বের চরিত্র বিচার করে আমাদের জন্মভূমির স্বাধীনতা, জনগণের স্বাধীনতা, সর্বোপরি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ও ইসলামের স্বার্থে একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চিরাচরিত বিবাদপূর্ণ সংস্কৃতির পরিবর্তে সবার জন্য ফলপ্রদ একটি বাংলাদেশ কওমী-জগতের প্রধান প্রত্যাশা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে কোন দেশের লেজুড়বৃত্তি পরিহার করে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণোত্তর বিশেষত মুসলিম দেশের সাথে সার্বিক উন্নয়নবান্ধব সম্পর্কের মাধ্যমে মর্যাদ্সম্পন্ন বাংলাদেশকে কওমী-জগৎ আন্তরিকভাবেই কামনা করে। সাথেসাথে, যে কোন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কঠিন শপথে বলিয়ান হবার তাগিদ দেয় কওমী-জগৎ। এই হোক আমাদের বিজয়-দিবসের সামগ্রিক ভাবনা ও চেতনা।

Leave a comment

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: