শিরোনাম
জুমার মিম্বার থেকে বাবুনগরী : আল্লাহ ফেরআউনকেও সুযোগ দিয়েছেন, তবে ছেড়ে দেননি আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে ভারতের উদ্বেগ মসজিদ-মাদ্রাসা উন্মুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়ে মুফতি আজম আবদুচ্ছালাম চাটগামীর খোলা চিঠি রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হেফাজত আমীর আল্লামা বাবুনগরীর আহ্বান গ্রেফতার আতঙ্কে ঘর ছাড়া হাজারো আলেম, দুর্ভোগে পরিবার মসজিদ লক করার ইখতিয়ার কারো নেই : মুফতি সাখাওয়াত চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে রোজার অতুলনীয় উপকার, বিবিসির প্রতিবেদন পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা গিয়েছে, কাল রোজা ইসলামাবাদীসহ গ্রেফতারকৃত হেফাজত নেতাকর্মীদের মুক্তি দিতে হবে : আমীরে হেফাজত  আল্লামা শফীর ইনতিকাল স্বাভাবিক, পিবিআইয়ের রিপোর্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার : হেফাজত আমির
রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ১২:১০ অপরাহ্ন
add

ব্যক্তি ও শক্তির পূজা আলেমদের শান নয়

আবু জোবায়ের
প্রকাশের সময় : রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২০
add

মহান আল্লাহ তাআলা প্রিয় বান্দাদেরকে হিদায়াতের পথে পরিচালিত করার জন্য নবী-রসুলগণকে প্রেরণ করেছেন। তাদের উপর আসমানী কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। যেন প্রিয় বান্দারা শয়তানের রাস্তা পরিহার করে চিরস্থায়ী সুখের ঠিকানা জান্নাতের পথে চলতে পারে। নবী-রাসূলগণ তাদের অর্পিত দায়িত্ব শতভাগ আদায় করেছেন। তাদের পর এ মহান দায়িত্ব উলামায়ে কেরামের উপর অর্পিত হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, তাঁরা নবী-রসূলগণের স্থলাভিষিক্ত হয়ে আল্লাহর দ্বীনের সকল বিধান সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করবে। দীনকে দুনিয়া উপার্জনের হাতিয়ার বানাবে না। দুনিয়ার তুচ্ছ মোহে আল্লাহর কোন বিধান গোপন করবে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

“স্মরণ করুন, যাদেরকে কিতাব (-এর ইলম) দেয়া হয়েছে, আল্লাহ যখন তাদের থেকে এ অঙ্গীকার নিলেন যে, তোমরা অবশ্যই তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না।” (সূরা আলে ইমরান: ১৮৭)

অন্যত্র ইরশাদ করেন,

“আর তোমরা আমার আয়াতগুলোর বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করো না।” (সূরা মায়িদা : ৪৪)

যুগে যুগে প্রকৃত আলেমরা লোভ ও প্রলোভন এবং প্রবৃত্তির প্রবল প্ররোচনার মুখে তাদের আত্মসংযম, সততা, নৈতিক শুচিতা ও চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করে চলেছে। ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস আলেমদের ইখলাস ও আমাতদারিতা এবং সংযম ও আত্মসম্বাদের ঘটনায় ভরপুর। যার নজির সমগ্র মানব ইতিহাসে খুব কমই পাওয়া যাবে।

কারণ, একজন প্রকৃত আলেমের অবিচল ঈমান ও বিশ্বাস এবং তাওয়াক্কুল ও নির্ভরতা– এটা তাদের অন্তর থেকে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর ভয়-ভীতি এবং শঙ্কা ও আশঙ্কা সম্পূর্ণরূপে মুছে দেয়। তাদের কোন পদ বা দুনিয়ার লোভ থাকে না। তাঁরা কোন জালিম ও বাতিলের সামনে নত হয় না, তাদের ভয়ে সত্যকে গোপন করে না, তাদের সমর্থনে দীনের বিকৃত ব্যাখ্যা করে না; হোক তা কোন রাষ্ট্রশক্তি কিংবা কোন পরাশক্তি।

কিন্তু অপ্রিয় সত্যটি হলো, হক্কানি উলামায়ে কেরাম এ দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে আদায় করলেও অনেক নামধারী আলেম আল্লাহ তাআলার এ অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। দুনিয়াবি স্বার্থে তারা আল্লাহর বিধান গোপন করেছে। দীনকে দুনিয়া উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। আল্লাহর বিধানে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজন-বিয়োজন করে এবং আল্লাহর কিতাবের অপব্যাখ্যা করে তারা দুনিয়ার তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করেছে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

“এরপর তারা সে অঙ্গীকার পিঠের পশ্চাতে ছুঁড়ে ফেলে দিলো এবং এর বিনিময়ে খরিদ করল সামান্য ‍মূল্য। কত নিকৃষ্ট মূল্যই না তারা খরিদ করছে।” (সূরা আলে ইমরান : ১৮৭)

হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,

“হে ইলমের ধারক-বাহকেরা, তোমরা ইলম অনুযায়ী আমল করো। কেননা, আলেম তো সে-ই যে ইলম শিখেছে এরপর আমল করেছে এবং তার ইলমের সাথে আমলের মিল আছে। অচিরেই এমন সব লোক আসবে যারা ইলম ধারণ করবে কিন্তু তা তাদের গলদেশ অতিক্রম করবে না। তাদের ভেতর-বাহির মিল থাকবে না। তাদের আমল অর্জিত ইলমের বিপরীত হবে। ।” (জামিউ বয়ানিল ইলম : ১/৬৯৪, হাদিস নং ১২৩৭)

হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানি রহ. বলেছেন–

‘খাঁটি দীনদার আলেমের সংখ্যা খুবই কম। যাদের মধ্যে মালের মহব্বত, নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের মহব্বত, ইজ্জত-সম্মানের মহব্বত এবং পদ-গৌরবের মহব্বত নাই তারাই দীনদার আলেম। প্রকৃত নায়েবে নবী। একমাত্র আল্লাহর দীন ও নবীর তরিকা জারি করা ব্যতীত তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত কোনই উদ্দেশ্য থাকে না। কিন্তু উলামায়ে ‘ছু’ যারা, তাদের উদ্দেশ্য হবে সরকারের পক্ষ সমর্থন করে নিজের মতলব হাসিল করা।”

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. বলেন,

‘আমাদের যেসব আলেম বিচ্যুতির শিকার হবে তাদের মধ্যে ইহুদিদের সাদৃশ্য রয়েছে আর যেসব আবেদ বিচ্যুত হবে তাদের মধ্যে খ্রিস্টানদের সাদৃশ্য রয়েছে।’

ইহুদিদের কিতাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবৃত সিফাতগুলো, যেগুলো তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাতের সাক্ষী–  ইহুদিরা সেগুলো গোপন করেছে। গোপন করেছে যেন তাদের নেতৃত্ব ছুটে না যায়। আরবদের থেকে যেসব হাদিয়া-তোহফা আর সম্মান পেতো সেগুলো যেন বন্ধ না হয়ে যায়। তাদের ভয় হলো– (আল্লাহ তাদের উপর লা’নত বর্ষণ করুন) যদি তারা তা প্রকাশ করে দেয় তাহলে লোকজন রাসূলুল্লাহর অনুসারী হয়ে যাবে এবং তাদের পরিত্যাগ করবে। যে তুচ্ছ স্বার্থ তারা লাভ করতো তা বহাল রাখতে তারা সত্য গোপন করলো। এ সামান্য মোহে নিজেদের বিক্রি করে দিল।” (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/৪৮)

পূর্ব যুগে ইহুদি আলেমরা এভাবেই বিচ্যুতির শিকার হয়েছিল। উম্মতে মুসলিমার মধ্যেও এমন লোকের অভাব নেই, যারা ইহুদি-খ্রিস্টানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

“নিঃসন্দেহে তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের লোকদের রীতি-নীতির অনুকরণ করবে। বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে। এমনকি তারা যদি ‘দবে’র (সাপের মতো এক ধরণের প্রাণী) গর্তে প্রবেশ করে থাকে তাহলে তোমরাও তাদের অনুসরণ করবে”। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইহুদি-খ্রিস্টানদের কথা বলছেন”? তিনি উত্তর দেন, “তাহলে আর কারা?” (সহীহ বুখারি : ৬৮৮৯)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,

“সালাফগণ মনে করতেন, যেসব আলেম-উলামা সিরাতে মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত হবে তাদের মধ্যে ইহুদিদের সাদৃশ্য রয়েছে আর যেসব জাহেদ আবেদ সিরাতে মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত হবে তাদের মধ্যে খ্রিস্টানদের সাদৃশ্য রয়েছে।”
(মাজমুউল ফাতাওয়া : ১/৬৫)

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. বলেন,

“এ উম্মতের মাঝে ইহুদিদের নজির দেখতে চাইলে দুনিয়ালোভী উলামায়ে ছু-দের দিকে তাকাও।”
(আলফাওযুল কাবির : ৫৩)

অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, বর্তমান সময়ে আমাদের আশেপাশে পদের পাগল ও দুনিয়ালোভী আলেমদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। এরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, দুর্নীতি করা, দীনের অপব্যাখ্যা করা, এবং সরকারের দালালি করাসহ এমন কোন ঘৃণ্য কাজ নেই যা তাঁরা করছে না। তাঁরা গিরগিটির মতো পরিস্থিতি বুঝে নিজেদের রং পাল্টে ফেলে। অথচ কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে এ বিষয়গুলোর ব্যাপারে হুঁশিয়ারি ও নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

দুটি ক্ষুধার্ত বাঘকে ছাগল পালের মধ্যে ছেড়ে দিলে ছাগল পালের যে ক্ষতি করে, তার চেয়ে অধিক ক্ষতিকর মানুষের সম্পদ ও ধর্মীয় পদমর্যাদার লোভ। (তিরমিজি)

তিনি অন্যত্র বলেছেন,

“যে ব্যক্তি শাসকের দরবারে গমন করবে সে ফিতনার শিকার হবে।” (সুনানে আবু দাউদ : ২৮৫৯)

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন,

“আলেমদের মধ্যে যারাই দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দেয় এবং দুনিয়ার প্রেমে পড়ে যায়, তারা তাদের ফতোয়া, বিচারাচার ও বর্ণনায় আল্লাহর উপর কিছু অসত্য কথা বলবেই। এছাড়া গত্যন্তর নেই। কেননা, রব্বে কারীমের বিধান অনেক সময়ই মানুষের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে গিয়ে থাকে; বিশেষত ক্ষমতাশীলদের, যারা প্রবৃত্তিরই পেছনেই পড়ে থাকে। অনেক সময়ই হকের বিরুদ্ধে যাওয়া এবং হক প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া তাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না। আলেম ও বিচারক যখন ক্ষমতালোভী হয়, প্রবৃত্তির অনুসারী হয়; তখন ক্ষমতার লোভ ও প্রবৃত্তির পথে প্রতিবন্ধকরূপে দাঁড়ানো হককে প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্ভব হয় না।” (আলফাওয়ায়িদ : ১০০)

বাহ্যিক দৃষ্টিতে কেউ যত বড়ো আলেমই হোক না কেন যখন রৈপিক কামনা-বাসনা ও স্বার্থ তার ওপর প্রবল হয়ে যায়, তখন সে জ্ঞান, সম্মান ও  নৈকট্য সবকিছু হারিয়ে বসে। সারা জীবনের জন্য সে চরম লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার মুখোমুখি হয়। তাঁর পরিণতি হয় অত্যন্ত ভয়াবহ। বর্তমান সময়েই এর বহু নজির আছে।
আমাদের দুনিয়ালোভী অসৎ আলেমদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে। তাদের গোমরাহি ও পথভ্রষ্টতা যেন আমাদের প্রভাবিত করতে না পারে। দীনের নামে তাদের বিকৃত ও খন্ডিত ইসলামের চর্চা যেন না হয়।
তবে হতাশ হওয়া যাবে না, আমাদের আশেপাশে এখনও অনেক হক্কানি আলেম আছেন। যাদের সংশ্রব ও দিকনির্দেশনা মেনে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের পথে চলতে পারব, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য দীনের পথে চলা সহজ করে দিন।


তরুণ আলেম লেখক
শিক্ষার্থী: দারুল উলুম হাটহাজারী

Leave a comment

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: