শিরোনাম
ফটিকছড়িতে সংবর্ধিত আমিরে হেফাজত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ধর্ম প্রতিমন্ত্রী পদে আজ সন্ধ্যায় শপথ গ্রহণ করবেন জামালপুর-২ (ইসলামপুর) আসনের সংসদ সদস্য ফরিদুল হক খান দুলাল নাগার্নো-কারাবাখে আমরা পরাজিত হয়েছি: আর্মেনিয়ার প্রেসিডেন্ট আল আমিন সংস্থার তিনদিন ব্যাপী তাফসিরুল কোরআন মাহফিল উপলক্ষ্যে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত রামগড় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে ওলামা ঐক্য পরিষদের সৌজন্য সাক্ষাৎ হেফাজতের কমিটি নিয়ে আমাদের সময় পত্রিকার প্রতিবেদন ডাহামিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গাজার উত্তরাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বিমান মুসলিম সভ্যতা বিরোধী মূর্তি নির্মাণের প্রতিবাদ করায় মামুনুল হক ও চরমোনাই পীরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে চরমপন্থী মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ‘মহানবী সা. এর শানে বেআদবি রক্তের বিনিময়ে প্রতিহত করা হবে’: আল্লামা জুনায়দ বাবুনগরী  হাটহাজারী উপজেলাধীন মধ্য মাদার্শায় হেফাজত কর্মীদের উপর মাজারপন্থীদের পরিকল্পিত হামলা : আহত ৪
বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৬:৪০ অপরাহ্ন
add

মানবতার দরদি কবি ফররুখ আহমদ

কওমি ভিশন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯
add

মিজানুর রহমান


বাঙালি জাতির দু’টি মারাত্মক দোষ রয়েছে। দোষ দু‘টি খুবই প্রভাবশালী ও প্রতিক্রিয়াশীল। যার ফলে এ জাতির কপালে বহু কলঙ্ক জুটেছে। অসংখ্য সাফল্য হাতছাড়া হয়েছে। ঘটেছে বহু প্রতিভার অপমৃত্যু। সে সর্বনাশা দোষ দু’টি হলো- অকৃতজ্ঞতা ও অবমূল্যায়ন। এ দু’টি দোষের প্রভাবে অবহেলিত হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিমান কবি, ফররুখ আহমদ!
ফররুখ আহমদের কবিত্বগুণ ও কবিসত্তায় বির্তক নেই। বিতর্কের সুযোগই নেই। সমকালীন কবি-সহিত্যিকগণ অকপটে তার কাব্যপ্রতিভার স্বীকারোক্তি করে গেছেন। এমনকি যারা তার আদর্শের বিরোধী তারাও তার কবিসত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস করেননি। সেক্যুলার সমাজের জ্ঞানতাপস ড. আবদুল্লাহ আবু সায়িদ বলেন, “ আমার ধারণা, ফররুখ আহমদ কবিতা-অঙ্গনে আজো পর্যন্ত আমাদের ‘সর্বশেষ’ কবি, তাঁর পরে ছোট বা বড় কোনও অর্থে আর কোন ‘সম্পূর্ণ কবি’ পাইনি আমরা আমাদের সাহিত্যে”
কিন্তু স্বীকারোক্তি ও মূল্যায়ন এক বিষয় নয়। কবিত্বগুণের স্বীকৃতি দিতে হয়েছে প্রায় বাধ্য হয়ে। কারণ, ফররুখের কবিতার কাব্যরীতিতে আপত্তি তুলবে কে? ছন্দ, মাত্রায় অসঙ্গতি বের করার সুযোগ কোথায়? বরং কাব্যচর্চায় ফররুখকে সামনে রাখলে তারাই উপকৃত হয়। তবে এ মহান কবিকে তারা জাতীয়ভাবে মূল্যায়ন করতে মোটেই প্রস্তুত ছিলো না। এখানেই কবি ফররুখ বাঙালি হয়েও বাঙালি জাতির কাছে চরম অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছেন। জাতীয়ভাবে সাহিত্য-সংস্কৃতির যতো আয়োজন হয়, সবখানেই সেক্যুলার সমাজ ফররুখকে এড়িয়ে চলেছে। যেন বাঙলা সাহিত্যে এ শক্তিমান কবির কোন প্রভাবই নেই! আজ তিনি যদি ‘ইসলামি রেনেসাঁর কবি’ না হতেন, তাহলে সেক্যুলার সমাজ জীবনানন্দের জায়গায় তাকেই স্থান দিতো।
ফররুখ আহমদকে অবমূল্যায়নের প্রধান কারণ হলো- তার আদর্শ। তিনি ইসলামি ভাবধারার কবি। সেক্যুলারদের দাবি- ‘তিনি আপন আদর্শের বৃত্ত থেকে নিজেকে বের করতে পারেননি। তার সমস্ত কবিসত্তা একটি আদর্শকে প্রতিষ্ঠার জন্যেই নিবেদিত ছিল। তিনি মুসলিম জাতির কবি হতে পারেন। কিন্তু তিনি বাঙালি জাতির কবি নন। তার কবিতা হয়তো ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে, মানবতার কথা বলে না। এ কারণেই ফররুখ তাদের কাছে অত সমাদৃত হননি।’
ইসলামি ঘরানায় ফররুখ আহমদ রেনেসাঁর কবি নামে খ্যাত ও পরিচিত। উর্দুভাষায় যেমন ইকবাল অদ্বিতীয়। বাঙলা ভাষায়ও তেমন দ্বিতীয় কোন ফররুখ নেই। দুঃখজনক বিষয় হলো, উপমহাদেশে ইকবাল যতোটা মূল্যায়িত ও চর্চিত হয়েছে,বাংলাদেশে ফররুখ ততোটা হয়নি। ইসলামপন্থীরা ‘ইসলামি রেনেসাঁর কবি’কে নিয়ে গর্ববোধ করে। কিন্তু তাদের মাঝে ফররুখ-পাঠ এখনো মৌলিক ও ব্যাপক হয়ে ওঠেনি। ফররুখ-পাঠের এ দৈন্য সেক্যুলার সমাজকে ফররুখ-বিমুখতার ক্ষেত্রে আরো একধাপ এগিয়ে দিয়েছে। তারা তো মনেপ্রাণে চায়- বাংলা সাহিত্যে যেন ফররুখ ও তার কবিসত্তা বিস্মৃত হয়ে যায়। সুতরাং বিশ্ব দরবারে ফররুখের কবিসত্তা ও কাব্যপ্রতিভাকে উপস্থাপন করতে হলে ফররুখ-পাঠ ও চর্চার বিকল্প নেই।
ফররুখ মানবতার কথা বলে না, বিশেষ একটি আদর্শের কথা বলে- এ হলো ফররুখের বিরুদ্ধে কথিত মানবতাবাদীদের অভিযোগ। অথচ তার প্রায় কবিতা এ অভিযোগকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে। তার একটি নমুনা দেখুন-

….মেঠো পথ;পায়ে-চলা পথ,
কাকর বিছানো পথ: মজুরের আর
নিঃস্ব জনতার পথ টানিছে আমাকে।

ডাকে মানুষের পথ
নিরন্ন ক্ষুধিত শীর্ণ মানুষের পথ,
ধর্ষিতা মায়ের রিক্ত ক্রন্দনের পথ
সংকীর্ণ আবদ্ধ পথ পীড়িত আত্মার,
অশান্ত ক্ষুধিত পথ বিপ্লবী মনের

শৃংখলিত মনে আর শৃংখলিত পথে
মৃত্যু সন্নিবিষ্ট দৃঢ় আজাদীর পথ

যে পথের ধূলিমাঝে পতাকা সাম্যের
উঠায়েছে ঊর্ধ্বশির, সে-পথে আমার
আরদ্ধ জীবন…….

(পথ: আজাদ করো পাকিস্তান)

ফররুখের কবি-মানস সর্বদা মানবতার তরেই নিবেদিত ছিলো। কমরেড এন এন রায়ের প্রতি অনুরক্ত হয়ে যে মতাদর্শ তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তাতে তিনি মানবতার চিরশান্তি ও মুক্তির সন্ধান পাননি। তিনি ইসলামি আদর্শ ও চেতনার মাঝে মানবতার চূড়ান্ত বিকাশ ও মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছেন। অতঃপর তিনি ইসলামি ভাবধারাকে মাধ্যম করে আজীবন সত্য ও মানবতার জয়গান গেয়ে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন- মুসলিম জাগরণের মধ্যেই কেবল বিশ্বমানবতার সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব।
হাতেম তায়ীর উদার দানশীলতা তাকে বিমুগ্ধ করেছে। দুর্ভিক্ষপীড়িত জনতার মাঝে একজন হাতেম তায়ীকে তিনি জাগাতে চেয়েছেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে হাতেম তায়ীর প্রশংসা করেছিলেন, তাকেই তিনি মুসলিম উম্মাহর মাঝে জাগাবার জন্য রচনা করেছেন তার অমর কাব্যনাট্য- নৌফেল ও হাতেম। পাশাপাশি ‘হাতেম তায়ী’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থও রচনা করেছেন।

সাম্প্রদায়িক কবি বলে সেক্যুলার সমাজ কবি ফররুখকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য হলো- ইসলামি ভাবাদর্শের কোন কবি বা সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে শক্তিমান হয়ে বেঁচে থাকতে পারবে না। জীবদ্দশায় তারা জীবন্মৃত থাকবে আর মরণোত্তর তারা হবে বিস্মৃত। এ মহান কবির প্রতি এ কেমন অবিচার! অথচ তিনি সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার বহু উর্ধ্বে ছিলেন। চল্লিশের দশকে যখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো,তখন কবি ফররুখ তার ‘লাশ’ কবিতাটি কার জন্য লিখেছিলেন? আপন সম্প্রদায়ের জন্য? না আর্তপীড়িত মানবতার জন্য?! দুর্ভিক্ষ নিয়ে সমকালীন অনেক কবিতা রচিত হয়েছিলো। কিন্তু ফররুখের ‘লাশ’ কবিতায় দুর্ভিক্ষের যে করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে,তা অন্যদের কবিতায় অতোটা চিত্রায়িত হয়নি। দেখুন ‘লাশ’ কবিতার কিছু অংশ-

যেখানে প্রশস্ত পথ ঘুরে গলে মোড়,
কালো পচি-ঢালা রঙে লাগে নাই ধূলরি আঁচড়,
সখোনে পথরে পাশে মুখ গুঁজে পড়ে আছে জমনিরে পর;
সন্ধ্যার জনতা জানি কোনদনি রাখে না সে মৃতরে খবর।
জানি মানুষরে লাশ মুখ গুঁজে পড়ে আছে ধরণীর ‘পর,
ক্ষুধতি অসাড় তনু বত্রশি নাড়ীর তাপে প’ড়ে আছে

নিঁসাড় নথির,
পাশ দয়িে চ’লে যায় সজ্জতি পিশাচ, নারী নর
-পাথররে ঘর,
মৃত্যু কারাগার,
সজ্জতিা নপিুণা নটী বারাঙ্গনা খুলয়িাছে দ্বার
মধুর ভাষণে,
পৃথবিী চষিছে কারা শোষণে, শাসনে
সাক্ষ্য তার রাজপথে জমনিরে ‘পর
সাড়ে তনি হাত হাড় রচতিছেে মানুষরে অন্তমি কবর।
প’ড়ে আছে মৃত মানবতা
তারি সাথে পথে মুখ গুঁজে।
……….

শাশ্বত মানব-সত্তা, মানুষরে প্রাপ্য অধিকার,
ক্ষুধিত মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে রুধিয়া দুয়ার,
মানুষরে হাড় দিয়া তারা আজ গড়ে খেলাঘর;
সাক্ষ্য তার প’ড়ে আছে মুখ গুঁজে ধরণীর ‘পর।

জড়পন্ডি হে নিঃস্ব সভ্যতা।
তুমি কার দাস?
অথবা তোমারি দাস কোন পশুদল।
মানুষরে কী নিকৃষ্ট স্তর।
যার অত্যাচারে আজ প্রশান্ত মাটির ঘর: জীবন্ত কবর
মুখ গুঁজে প’ড়ে আছে ধরণীর ‘পর।
…………………

হে জড় সভ্যতা।
মৃত-সভ্যতার দাস স্ফীতমদে শোষক সমাজ।
মানুষের অভিশাপ নিয়ে যাও আজ।
তারপর আসিলে সময়
বিশ্বময়
তোমার শৃঙ্খলগত মাংসপিণ্ডি পদাঘাত হানি
নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বার-প্রান্তে টানি;
আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যু-র্দীণ নিখিলের অভিশাপ বও;
ধ্বংস হও
তুমি ধ্বংস হও ॥

তিনি অর্থ ও খ্যাতির মোহে কাব্যচর্চা করেননি। আজ যারা তার সমালোচনায় লিপ্ত, তাদের মতো তিনি সাহিত্য বিক্রি করে খাননি। তাই তার জীবনে জীবিকার টানাপোড়েন লেগেই ছিলো। আবার তিনি ইসলামি ভাবাদর্শের কবি বলে সরকারি কোন সুবিধা ভোগ করতে পারেননি। কোন জাতি তার মহান ব্যক্তিদের সাথে এতোটা অবিচার করেছে কি না আমার জানা নেই। এমনকি মৃত্যুর পর তার কবরের জায়গা নিয়েও কম ঝক্কিঝামেলা হয়নি। বামপাড়ার কবি শামসুর রহমান সুন্দর বলেছেন-

‘তাঁর কবররে জমি নিয়ে যত ঝামেলািই হোক, তাঁর সন্তানেরা যত বঞ্চিতই হোক পার্থিব জমিজমা থেকে তিনি রেখে গেছেন অন্যরকম বিঘা বিঘা জমি- যে জমির ফসল দেখে চোখ জুড়াবে সাহত্যি-পথযাত্রীদের…..

বাংলা সাহিত্যে আজ কবির অভাব নেই। সর্বত্র প্রতিনিয়ত গজিয়ে উঠছে নানা অভিধার চটকদার কবি! কিন্তু ফররুখের মতো স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে কোন কবি এ জাতির ভেতর থেকে সৃষ্টি হচ্ছে না। এমন অকৃতজ্ঞ জাতির কপালে ফররুখ বারবার জুটে না!!


Image may contain: 1 person, beard, eyeglasses, hat and closeup

তরুণ আলেম, লেখক, চিন্তক।

Leave a comment

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: